ঢাকা   মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

সূচক বাড়ে, শিল্পে আসে না মূলধন: কেন পিছিয়ে শেয়ারবাজার?

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২৯, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

সূচক বাড়ে, শিল্পে আসে না মূলধন: কেন পিছিয়ে শেয়ারবাজার?

দেশের শেয়ারবাজারে সূচকের উত্থান-পতন আর লেনদেনের ওঠানামা নিয়মিত আলোচনায় এলেও শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগানের ক্ষেত্রে বাজারটির ভূমিকা এখনো সীমিত। নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের বড় অংশকে নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যাংকঋণের ওপর। এতে বাড়ছে সুদ ব্যয়, আর্থিক চাপ ও ব্যবসার ঝুঁকি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—শেয়ারবাজারের আকার বাড়লেও কেন তা দেশের উৎপাদনশীল খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারছে না?

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়লেও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তী সময়ে শুরু হয় দরপতন ও লেনদেনের মন্দা। ২৫ অক্টোবর সূচকটি নেমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৩২ পয়েন্টে। একই দিনে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৩০ কোটি টাকা।

তবে বাজারের মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সূচকের ওঠানামা নয়; বরং নতুন মূলধন সংগ্রহে এর সীমিত সক্ষমতা। শেয়ারদর বাড়লে বাজার মূলধন বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই বৃদ্ধি মানেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাতে নতুন বিনিয়োগের অর্থ পৌঁছানো নয়। কার্যকর শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে হলে কোম্পানির নতুন শেয়ার ইস্যু, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), রাইট শেয়ার এবং বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বাজারের আকার বাড়লেও নতুন মূলধন সংগ্রহে ঘাটতি

চলতি বছরের জুন শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় দেশের শেয়ারবাজারের বাজার মূলধনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এক বছর আগে এ হার ছিল ১০ দশমিক ৮২ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানে বাজারের আকার বাড়ার ইঙ্গিত থাকলেও শিল্প ও ব্যবসায় নতুন অর্থ সরবরাহের চিত্র আলাদা। কারণ, বিদ্যমান শেয়ারের দাম বাড়লে বাজার মূলধন বৃদ্ধি পায়; কিন্তু কোম্পানি নতুন শেয়ার ইস্যু না করলে সেই অর্থ সরাসরি প্রতিষ্ঠানের তহবিলে যুক্ত হয় না।

একটি কার্যকর শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি, নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য সিকিউরিটিজ এবং সক্রিয় লেনদেনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সঞ্চিত অর্থকে উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ এখনো সীমিত থাকায় শেয়ারবাজার শিল্পায়নের অর্থায়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।

করপোরেট বন্ড বাজার এখনো সীমিত

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমাতে করপোরেট বন্ড গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়ন সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণের ওপর চাপও কমতে পারে।

তবে এ বাজারের বিকাশে কয়েকটি শর্ত পূরণ জরুরি। ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ ক্রেডিট রেটিং, বিভিন্ন মেয়াদের বন্ড এবং মাধ্যমিক বাজারে নিয়মিত লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনে সহজে বন্ড বিক্রি করতে পারবেন—এমন ব্যবস্থা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে তাঁদের আগ্রহ সীমিত থাকতে পারে।

বাংলাদেশে করপোরেট বন্ডের বাজার এখনো তুলনামূলক ছোট ও সীমিত লেনদেননির্ভর। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রও প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তৃত হয়নি।

প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি তহবিলে রয়েছে সম্ভাবনা

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের আরেকটি সম্ভাব্য উৎস হতে পারে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও পেনশন তহবিল। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এসব তহবিলের সম্ভাব্য সম্মিলিত আকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। তবে এ পরিমাণের নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

এসব তহবিলের অর্থ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা গেলে শিল্প, অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়তে পারে। এ জন্য প্রয়োজন পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন ট্রাস্টি, স্বচ্ছ বিনিয়োগনীতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামো।

তবে তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীদের স্বার্থ ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সুশাসন ও জবাবদিহি ছাড়া এসব অর্থকে শেয়ারবাজারে প্রবাহিত করার উদ্যোগ উল্টো ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সরাসরি তালিকাভুক্তি যথেষ্ট নয়

গত ১৮ অক্টোবর ‘ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলস, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিধিমালার মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ সম্প্রসারিত হলেও বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানির হাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন মূলধন আসে না।

তাই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বাড়াতে শুধু তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করলেই হবে না। নতুন ইক্যুইটি ইস্যু, রাইট শেয়ার এবং করপোরেট বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ভালো আর্থিক ভিত্তি ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে—এমন কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোও বড় চ্যালেঞ্জ

নতুন নীতিমালা ও তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে স্বচ্ছতা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেনের যথাযথ নজরদারি এবং শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা টেকসইভাবে ফিরবে না।

একই সঙ্গে আর্থিকভাবে দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির মান যাচাই না করে তালিকাভুক্তির সুযোগ দিলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কোম্পানির মান যাচাই, তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করতে কর-সুবিধা, বন্ডের লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ এবং সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ বাজারের বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

সূচক নয়, নতুন মূলধন সংগ্রহই হোক সাফল্যের মাপকাঠি

শেয়ারবাজারের কার্যকারিতা শুধু সূচকের উত্থান কিংবা দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। নতুন কোম্পানি কতটা মূলধন সংগ্রহ করছে, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নতুন বিনিয়োগ পাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কতটা বাড়ছে—এসব সূচকও গুরুত্বপূর্ণ।

শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে শেয়ারবাজারকে কার্যকর অর্থায়নব্যবস্থায় পরিণত করা জরুরি। এর জন্য নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সম্প্রসারণ, করপোরেট বন্ড বাজারের বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি না হলে সূচকের সাময়িক উত্থান দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি দূর করতে পারবে না।