ভুয়া নাম ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়। গত ১৫ বছরে ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে বিতরণ করা এসব ঋণের এক টাকাও আদায় হয়নি। বর্তমানে পুরো ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।
শুধু বেনামি ঋণ নয়, খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, মূলধন ঘাটতি ও বড় অঙ্কের লোকসানে আর্থিক সংকটে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটি। ২০২৫ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট ঋণ ও অগ্রিমের ৬১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। একই সময়ে মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
নাসা ও সিকদার গ্রুপের ঋণও খেলাপি
বিশেষ নিরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, আইএফআইসি ব্যাংক থেকে নাসা গ্রুপ নিয়েছে ১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে সিকদার গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এসব ঋণের পুরোটাই খেলাপি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকৃত ঋণগ্রহীতার পরিচয় আড়াল করে আত্মীয়স্বজন, কর্মচারী, ভুয়া কোম্পানি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের পরিমাণ ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক।
এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা
আইএফআইসি ব্যাংকের ২০২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ২৪ হাজার ৫৮৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৫ অর্থবছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ২৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কয়েকটি বড় ঋণ হিসাবের অবনতির কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঋণ আদায়, শ্রেণীকৃত ঋণ নিয়মিত করা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে অর্থ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
মূলধন পর্যাপ্ততা নেমেছে ১.৮২ শতাংশে
ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৫ অর্থবছর শেষে নিয়ন্ত্রক মূলধন ছিল ১ হাজার ৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বিপরীতে প্রয়োজনীয় মূলধন ছিল ৫ হাজার ৮৬৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা।
একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার কমে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে আসে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত হার ১০ শতাংশ। বড় অঙ্কের লোকসান ও সম্পদের মানের অবনতিকে মূলধন দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুদ আয় কমেছে, লোকসান বেড়েছে
২০২৫ অর্থবছরে আইএফআইসি ব্যাংকের সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২১০ কোটি ২১ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৪ হাজার ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সুদ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে আমানত ও ঋণের বিপরীতে সুদ ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৪১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ফলে নিট সুদ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ সময়ে পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসানও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায়।
সঞ্চিতি ঘাটতিও বড় উদ্বেগ
নিরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির সাধারণ সঞ্চিতির বিপরীতে ঘাটতি রয়েছে ৬৯৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য ব্যাংকে রাখা মেয়াদি আমানত ও অফ-ব্যালান্স শিট দায়ের বিপরীতে আরও ৩০০ কোটি টাকার বেশি সঞ্চিতি ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে।
তবে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ঋণ ও আমানতের বিপরীতে প্রায় ২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার সঞ্চিতি সমন্বয় না করেই ২০২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার অনুমতি দেয়।
যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে শ্রীপুর টাউনশিপ। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের স্থিতি ১ হাজার ২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া আসাদ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নামে ৭৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা, গ্লোয়িং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নামে ৭২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং কুইক রিয়েল এস্টেটের নামে ৬৮৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে।
অন্যান্য বড় ঋণগ্রহীতার মধ্যে রয়েছে সানস্টার বিজনেস, ফারইস্ট বিজনেস, কসমস কমোডিটিজ, ব্লুমুন ট্রেডিং, আলফা এন্টারপ্রাইজ, অ্যাক্সিস বিজনেস, এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল, ভিস্তা ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাবসোলিউট কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির নামে শত শত কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সার্ভ কনস্ট্রাকশন, অলট্রন ট্রেডিং, নর্থস্টোন কনস্ট্রাকশন, টিমবিল্ড কনস্ট্রাকশন, সেন্ট্রাল ল্যান্ড অ্যান্ড বিল্ডিংস, সৃষ্টি রিয়েল এস্টেট, ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন, গ্লোবাল এলপিজি, এলহাম ফ্যাশন, রাজ হাউজিং, ব্রাইটস্টার বিজনেস, সেন্ট্রাল হাইটস ঢাকা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ও এলহাম ইন্টারন্যাশনালের নামও ঋণসংক্রান্ত নথিতে রয়েছে।
নতুন বোর্ডের ওপরও পর্যবেক্ষক
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আইএফআইসি ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পরবর্তী সময়ে সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক সূচকের অবনতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে নতুন বোর্ডের ওপরও পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সব মিলিয়ে বেনামি ঋণ, বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও ধারাবাহিক লোকসানে আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি আরও চাপে পড়েছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অনাদায়ী ঋণ উদ্ধার, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
























