ঢাকা   বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বৈঠকে শুল্ক ও স্থলবন্দর নিয়ে বড় আলোচনা

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১২:৪২, ৮ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বৈঠকে শুল্ক ও স্থলবন্দর নিয়ে বড় আলোচনা

তিন বছর পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ কার্যদলের বৈঠক শুরু হয়েছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বৃহস্পতিবার থেকে দুই দিনব্যাপী এ বৈঠকে স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক বাধা দূর করা, ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক পুনর্বিবেচনা এবং আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশের বাণিজ্যঘাটতি কমানো, পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উপায় নিয়েও আলোচনা হবে।

বৈঠকে যোগ দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল বুধবার নয়াদিল্লি গেছে।

আলোচনায় পাটপণ্যে ভারতের শুল্ক

বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের বিষয়টি এবারের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা ও টুইন, হেসিয়ান কাপড়, পাটের বস্তা ও স্যাকিং ক্লথের ওপর সংশোধিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশি পাটের সুতা ও টুইনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন কোনো তদন্তের ভিত্তিতে এ শুল্ক আরোপ করা হয়নি; আগের শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার ভিত্তিতে হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশ থেকে আমদানি করা পিইটি ফিল্মের ওপর প্রতি টনে সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার অধিদপ্তর (ডিজিটিআর)। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান আকিজ বায়াক্স ফিল্মসের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত শুল্ক ৫৮ ডলার। তবে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত এ সুপারিশ কার্যকর হচ্ছে না।

স্থলপথের বাণিজ্যে বড় ধাক্কা

দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে স্থলবন্দর ব্যবহারে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানির সুবিধা বন্ধ করে দেয়। তবে সমুদ্রপথে আমদানির সুযোগ রাখা হয়।

এর কয়েক সপ্তাহ পর ভারতও বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসিসহ বিভিন্ন পণ্য স্থলপথে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। একই বছরের জুনে পাট ও নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্রপণ্যের ওপরও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়।

এর প্রভাব পড়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ভারতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টন। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন।

অর্থাৎ পরিমাণে বড় ধরনের পতন হলেও রপ্তানি আয় প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৭৫ কোটি ডলার, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১৭৬ কোটি ডলার।

তিন বছর পর বৈঠক

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কার্যদলের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। এর আগে ১৪তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালের ২ ও ৩ মার্চ নয়াদিল্লিতে।

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাণিজ্য আলোচনাতেও। ফলে নির্ধারিত সময়ে যৌথ কার্যদলের নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।

আগের বৈঠকগুলোতে স্থলবন্দর ও সমন্বিত সীমান্তচৌকির অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, সীমান্ত হাট চালু, রেলপথে পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া পণ্যের মানদণ্ড নির্ধারণে সমন্বয় ও পারস্পরিক স্বীকৃতি, বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে যৌথ সমীক্ষা এবং পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপোস্ট ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার বিষয়ও আগের আলোচনায় ছিল।

ব্যবসায়ীদের দাবিও থাকছে আলোচনায়

নয়াদিল্লির বৈঠকের এজেন্ডা তৈরির আগে গত মে মাসে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে ব্যবসায়ীরা স্থলবন্দরের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং আগে বাতিল হওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট-সুবিধা পুনরায় চালুর সুপারিশ করেন।

গত মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসীদাস বাধে এফবিসিসিআই নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে যৌথ ব্যবসায়ী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এর আগে গত আগস্টে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সব মিলিয়ে তিন বছর পর শুরু হওয়া যৌথ কার্যদলের এবারের বৈঠকে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, স্থলবাণিজ্য স্বাভাবিক করা এবং পাটসহ বাংলাদেশি পণ্যের ভারতীয় বাজারে প্রবেশ সহজ করার বিষয়গুলোই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

সর্বশেষ