জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে পণ্য পরিবহনে বাড়তে শুরু করেছে ট্রাকভাড়া। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খাতুনগঞ্জে পণ্য আনতে এবং এখান থেকে ঢাকা, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠাতে ট্রাকপ্রতি ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। কোনো কোনো পথে এই বৃদ্ধির অঙ্ক আরও বেশি।
পাবনা থেকে পেঁয়াজ নিয়ে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে আসা ট্রাকচালক মোহাম্মদ মাসুদের হিসাবে, চট্টগ্রাম এসে আবার পাবনায় ফিরতে তাঁর ট্রাকে প্রায় ২২০ লিটার ডিজেল লাগে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় পুরো যাত্রায় শুধু জ্বালানির পেছনেই অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা।
জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয় ইতিমধ্যে ট্রাকভাড়ায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে। খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইদ্রিসের আড়তে মঙ্গলবার পাবনা থেকে এক ট্রাক পেঁয়াজ এসেছে। তেলের দাম বাড়ার আগে এ পথে ট্রাকভাড়া ছিল ২৮ হাজার টাকা। নতুন দামে একই ট্রাকের জন্য দিতে হয়েছে ৩২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ এক ট্রাকেই ভাড়া বেড়েছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা।
কুষ্টিয়া থেকেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। এক ট্রাক পণ্য খাতুনগঞ্জে আনতে আগে যেখানে ৩২ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হতো, এখন সেখানে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ পথে বাড়তি খরচ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও সাভারে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রেও ভাড়া বেড়েছে। বাংলাদেশ কভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ জানান, এসব গন্তব্যে আগের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-ঢাকা পথে আসা-যাওয়ার ভাড়া এখন ৩৭ থেকে ৩৮ হাজার টাকা, যা আগে ছিল ৩০ থেকে ৩১ হাজার টাকা।
দুই দিকেই বাড়ছে পরিবহন ব্যয়
খাতুনগঞ্জ ও আশপাশের চাক্তাই-আছদগঞ্জ দেশের অন্যতম বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, গম, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও বিভিন্ন মসলা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে আসে। আবার চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্যও এই বাজার হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যায়।
ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে পরিবহনের দুই পর্যায়েই। উৎপাদন এলাকা থেকে খাতুনগঞ্জে পণ্য আনতে যেমন বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে, তেমনি এখান থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পাঠাতেও খরচ বাড়ছে।
খাতুনগঞ্জে ট্রাকভাড়া নির্ধারণে শুধু দূরত্ব নয়, গাড়ির ধরন ও ধারণক্ষমতা, পণ্যের পরিমাণ, গাড়ির চাহিদা এবং ফিরতি পথে পণ্য পাওয়া যাবে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসে। ফলে একই দূরত্বের ক্ষেত্রেও ভাড়ায় পার্থক্য থাকে।
পাবনার ট্রাকচালক মোহাম্মদ মাসুদের ক্ষেত্রে জ্বালানির বাড়তি খরচই প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে ভাড়া বৃদ্ধির অঙ্কও প্রায় একই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কুষ্টিয়ার পেঁয়াজ, রসুন ও আদার পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স বরকত ভান্ডারের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম জানান, গত রোববার কুষ্টিয়া থেকে এক ট্রাক পণ্য আনতে ৩২ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছিল। তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর একই পথে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিবহন খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীদের পক্ষে তা নিজের পকেট থেকে বহন করা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে এর একটি অংশ যুক্ত হতে পারে। তাঁর হিসাবে, পণ্যভেদে কেজিতে ১ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা পথেও বাড়তি খরচ
খাতুনগঞ্জ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, গম, পেঁয়াজ, রসুন ও মসলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। তাই চট্টগ্রাম-ঢাকা পথে পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব শুধু একটি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়।
সওজের হিসাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ২৬৪ কিলোমিটার। তবে খাতুনগঞ্জ থেকে ঢাকার নির্দিষ্ট গন্তব্য অনুযায়ী প্রকৃত দূরত্ব কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
সওজের যানবাহন পরিচালন ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২৫০ কিলোমিটার পথে মাঝারি ট্রাকে প্রায় ৫০ লিটার এবং ভারী ট্রাকে প্রায় ৬২ দশমিক ৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়লে একমুখী যাত্রায় শুধু ডিজেলেই অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। যাওয়া-আসা মিলিয়ে তা প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
তবে এটি আদর্শ হিসাব। বাস্তবে গাড়ির আকার, ইঞ্জিনের ধরন, পণ্যের ওজন, যানজট ও চালানোর পদ্ধতির কারণে জ্বালানি খরচে পার্থক্য হয়।
খাতুনগঞ্জ থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে নিয়মিত পণ্য পরিবহন করেন ট্রাকচালক মহিবুর রহমান। তাঁর হিসাবে, ঢাকা গিয়ে ফিরে আসতে বড় ট্রাকে ১০০ থেকে ১১০ লিটার ডিজেল লাগে। ফলে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় একবারের যাত্রায় শুধু জ্বালানি খরচই বাড়ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা।
চালের বস্তায়ও বাড়তি পরিবহন খরচ
জ্বালানির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই চাল পরিবহনের খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম।
তাঁর হিসাবে, ২৫ কেজির এক বস্তা চাল পরিবহনে আগের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু পরিবহন ব্যয়ের হিসাবে প্রতি কেজি চালে অতিরিক্ত খরচ পড়ছে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ পয়সা।
খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পণ্য পরিবহনের শেষ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষিপণ্যের উৎপাদন পর্যায়েও খরচ বাড়তে পারে। এরপর উৎপাদিত পণ্য বাজারে আনতেও বাড়তি পরিবহন ব্যয় হবে।
তাঁর হিসাবে, কোনো ট্রাকের ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়লে পণ্যভেদে শুধু পরিবহন খরচের কারণে কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা বা তার বেশি ব্যয় যুক্ত হতে পারে।
বাজার থেকে দোকানেও বাড়ছে ভাড়া
দূরের জেলা বা বন্দর থেকে খাতুনগঞ্জে পণ্য পৌঁছানোর পরও পরিবহন ব্যয়ের প্রক্রিয়া শেষ হয় না। সেখান থেকে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা দোকানেও পণ্য পাঠাতে হয়। এই পর্যায়েও বাড়তি জ্বালানি খরচের প্রভাব পড়ছে।
খাতুনগঞ্জ থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য সরবরাহ করেন পিকআপচালক হাবিবুর রহমান। তাঁর গাড়িতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ লিটার ডিজেল লাগে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় দৈনিক জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা।
আগে প্রতি বস্তা পেঁয়াজ পরিবহনে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা নিতেন তিনি। এখন বস্তাপ্রতি আরও ১ থেকে ৫ টাকা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান।
আরেক পিকআপচালক মোহাম্মদ সুমনের হিসাবে, আগে প্রতিদিন তাঁর ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার ডিজেল লাগত। নতুন দামে দৈনিক জ্বালানি ব্যয় ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সবজি পরিবহনেও ৫–৬ হাজার টাকা বেশি
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের রেয়াজউদ্দিন বাজারের সবজি পরিবহনেও। মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও যশোরের মতো উৎপাদন এলাকা থেকে সবজি আনতে ট্রাকভাড়া ইতিমধ্যে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন রেয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক শিবলী।
তাঁর তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকা থেকে এক ট্রাক সবজি আনতে আগে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা ভাড়া লাগত। এখন তা বেড়ে ৪১ থেকে ৪২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামের কাছাকাছি চকরিয়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও হাটহাজারী থেকেও ছোট পিকআপে সবজি পরিবহনে আগের তুলনায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে।
তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লেও সবজির পাইকারি দাম এখনো একই হারে বাড়েনি। কারণ সবজি পচনশীল হওয়ায় সরবরাহ বেশি এবং ক্রেতা কম থাকলে ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিকভাবে পুরো বাড়তি পরিবহন খরচ বিক্রয়মূল্যে যোগ করতে পারেন না। ফলে এর একটি অংশ কৃষক ও ব্যাপারীর ওপরও পড়ছে।
ফারুক শিবলীর ভাষ্য, গাড়িভাড়া পরিশোধের পর সেই টাকা অনেক সময় ব্যাপারীর চালান থেকে কেটে নেওয়া হয়। ফলে পণ্য বিক্রির অর্থ থেকে গাড়িভাড়া ও কমিশন বাদ দেওয়ার পর তাঁদের হাতে কম টাকা থাকে।
তবে পরিবহন ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পণ্যের দামেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
























