ঢাকা   শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নিয়মতান্ত্রিক ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি যাচাইয়ে সুফল: ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি ১৩ ব্যাংকের

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৫৪, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিয়মতান্ত্রিক ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি যাচাইয়ে সুফল: ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি ১৩ ব্যাংকের

দেশের ব্যাংক খাতে যখন খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ছে, তখনও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে ১৩টি বেসরকারি ব্যাংক। গত জুন শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির মোট ঋণের বিপরীতে অনাদায়ী ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশের নিচে ছিল। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাই, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ঋণ পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য রাখার বিষয়গুলোকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ জুনভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, কম খেলাপি ঋণের এই তালিকায় রয়েছে কমিউনিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক।

তালিকায় সবচেয়ে কম অনাদায়ী ঋণের অনুপাত রয়েছে কমিউনিটি ব্যাংকের। জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ ছিল ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ায় অনুপাত দাঁড়ায় মাত্র ০ দশমিক ৩৩ শতাংশে।

এর পরের অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ৭৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির অনাদায়ী ঋণ ছিল ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। ফলে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ০৫ শতাংশে। দেশীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুনাফার দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে রয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের প্রকাশিত বিশ্বের ৫০০টি ভালো পারফরম্যান্সকারী ব্যাংকের তালিকাতেও জায়গা পেয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান জানান, ঋণ দেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঋণ অনুমোদনে স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ঋণের মান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।

কম খেলাপি ঋণের হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির মোট ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা খেলাপি ছিল। এ হিসাবে অনুপাত দাঁড়ায় ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ঋণ অনুমোদনে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার একক মতামতের পরিবর্তে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় খাতে অর্থায়নের ফলে ঋণের মান তুলনামূলক ভালো রয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তা ঋণেও গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।

চতুর্থ স্থানে থাকা সিটিজেনস ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত জুন শেষে ছিল ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

এর পরেই রয়েছে প্রাইম ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের মতে, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন কাঠামো এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক ও খাতে অর্থায়ন ব্যাংকটির ঋণমান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঋণে গুরুত্ব দেওয়ার সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

সপ্তম অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।

এরপর ধারাবাহিকভাবে রয়েছে যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক এবং সীমান্ত ব্যাংক। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩৫, ৪ দশমিক ০৭, ৪ দশমিক ১৯, ৪ দশমিক ৩৬, ৪ দশমিক ৮২ এবং ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

অর্থাৎ তালিকার সর্বশেষ ব্যাংক সীমান্ত ব্যাংকেও অনাদায়ী ঋণের অনুপাত ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে।

ব্যাংকারদের বক্তব্য, ঋণ বিতরণের সময় গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসার প্রকৃতি যাচাই করা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ফলে এসব ব্যাংকের ঋণের মান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বড় করপোরেট গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে এসএমই ও ভোক্তা অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়টিও ঝুঁকি ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, উচ্চ খেলাপি ঋণের সময়েও কিছু ব্যাংক সুশাসনের চর্চা ধরে রেখেছে। পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম, দক্ষ জনবল এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এসব প্রতিষ্ঠানের ভালো অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তিনি।

সার্বিক চিত্রে বড় চাপ

তবে ১৩টি ব্যাংকের এই চিত্র পুরো ব্যাংক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের বিপরীতে এর অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই জমা হয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, যা পুরো ব্যাংক খাতের অনাদায়ী ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ।

পরিমাণের হিসাবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংকে। জুন শেষে ব্যাংকটির অনাদায়ী ঋণ দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে জনতা ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৭৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।

একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ খেলাপি হিসেবে রয়েছে।

এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও অনাদায়ী ঋণের হার ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

ফলে ব্যাংক খাতে সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়লেও ১৩টি বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি যাচাই, সুশাসন এবং অর্থায়নের খাত বৈচিত্র্যময় রাখার কৌশল এসব ব্যাংকের ঋণমান নিয়ন্ত্রণে রাখার অন্যতম উপাদান হিসেবে উঠে এসেছে।