দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে গভীর সংকটে পড়েছে। আমানতের বিপরীতে ১০ শতাংশের বেশি সুদের প্রলোভন দেখিয়েও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নতুন গ্রাহক আকর্ষণ করতে পারছে না। ফলে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ—দুই কার্যক্রমই প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অবসায়নের তালিকায় রয়েছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকার আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অবসায়নের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানের একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। বর্তমানে প্রচলিত আমানত বিমা ব্যবস্থায় এ সীমা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা। নতুন সুবিধা বাস্তবায়নে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
বন্ধের পথে থাকা পাঁচ প্রতিষ্ঠানে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত প্রায় ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০২ কোটি টাকা।
সংকট শুধু এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে আরও চারটি এনবিএফআইকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য নির্দিষ্ট সময় দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নতি না হলে সেগুলোকেও একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে এনবিএফআই খাতের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৫১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এই সামান্য বৃদ্ধি মূলত সুদ সংযোজনের কারণে হয়েছে; নতুন আমানতের প্রবাহ এখনও উল্লেখযোগ্য নয়।
অন্যদিকে ঋণ বিতরণেও মন্দাভাব স্পষ্ট। মার্চ শেষে মোট ঋণ স্থিতি কমে ৭৮ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যেখানে ডিসেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ৭৮ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। নতুন ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় আদায় হওয়া অর্থের বড় অংশই পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যবহার হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণের তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘটনার প্রভাবেই এনবিএফআই খাতের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা তলানিতে নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অর্থ ফেরতের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
























