শেয়ারবাজারে সংঘবদ্ধ কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ২৫৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নতুন কমিশনের অনুমোদন মিললেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সাকিব আল হাসান ও আবুল খায়ের হিরুকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের অনুমোদন সাপেক্ষে চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে।
এর আগে ২৭ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন নির্ধারিত থাকলেও তা প্রস্তুত না হওয়ায় আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
গত বছরের ১৭ মে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন মামলাটি দায়ের করেন। এতে সাকিব আল হাসান, তার মা শিরিন আক্তার, সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক আবুল খায়ের হিরু, তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানসহ মোট ১৫ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত বিও হিসাব ব্যবহার করে ধারাবাহিক লেনদেন, প্রতারণামূলক সক্রিয় ট্রেডিং, স্পেকুলেশন ও অন্যান্য কৌশলের মাধ্যমে কয়েকটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে বাজারে কারসাজি করেন। পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সেই শেয়ারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে বিপুল মুনাফা তুলে নেওয়া হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির বিনিময়ে ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৩০৪ টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে। তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অস্বাভাবিক পরিমাণ শেয়ার বিক্রির লাভ (রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন) দেখিয়ে অর্থ বাজার থেকে তুলে বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, আবুল খায়ের হিরু তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের সহযোগিতায় প্রায় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকার অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করেন। এছাড়া তার নিয়ন্ত্রিত ১৭টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৫৪২ কোটি ৩১ লাখ টাকার সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।
সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, আবুল খায়ের হিরুর মাধ্যমে তিনি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স এবং সোনালী পেপারসের শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। দুদকের দাবি, এসব শেয়ারে বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি কারসাজিতে সহায়তা করেন এবং প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকার অবৈধ মুনাফা অর্জন করেন।
তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে জব্দ করেছে দুদক।
এই মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম মাদবর, কনিকা আফরোজ, মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাদবর, আলেয়া বেগম, কাজী ফুয়াদ হাসান, কাজী ফরিদ হাসান, জাভেদ এ মতিন, জাহেদ কামাল, হুমায়ুন কবির ও তানভির নিজাম।
এদিকে এই মামলার বাইরে সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে অর্থপাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও পৃথক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে দুদক।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাকিব আল হাসান। একই বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং এরপর আর দেশে ফেরেননি। একসময় দুদক ও বিএসইসির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাকিবকে ২০২৫ সালে শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি। পরে তার ব্যাংক হিসাব জব্দের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
























