রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার ওপর দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ঋণ বিতরণের সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এখন থেকে গ্রাহকের যোগ্যতা ও ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঋণ অনুমোদন করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংকের দাবি ছিল, আগের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় গ্রাহকদের অর্থায়ন ব্যাহত হচ্ছিল এবং এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। সেই আবেদন বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
যেসব শাখার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে সেগুলো হলো—স্থানীয় কার্যালয় শাখা, ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখা, শিল্প ভবন করপোরেট শাখা, শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ করপোরেট শাখা এবং চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখা। আগে এসব শাখায় সর্বোচ্চ ৫ থেকে ২০ কোটি টাকার মধ্যে ঋণ অনুমোদনের সীমা নির্ধারিত ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ওই সীমাবদ্ধতা আর থাকছে না।
সোনালী ব্যাংকের ওপর ঋণ নিয়ন্ত্রণের এই ব্যবস্থা প্রথম চালু হয় ২০০৭ সালে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাস্তবায়িত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে। পরে ২০১২ সালের হল-মার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির পর প্রতিষ্ঠানটির ঋণ কার্যক্রমে নজরদারি আরও কঠোর করা হয়। দীর্ঘ সময়ের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সম্প্রতি বড় গ্রাহকদের অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ঋণসীমা বাতিলের আবেদন জানায় সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই আবেদন মঞ্জুর করলেও নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে এবং বিতর্কিত বা ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দিয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানান, ব্যাংকের অধিকাংশ বড় ও সুনামধন্য গ্রাহক এই পাঁচ শাখার মাধ্যমে লেনদেন করেন। ঋণসীমা থাকায় তাদের অনেক আবেদন পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ায় এখন যোগ্য গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দেওয়া সহজ হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্থানীয় শাখাগুলোতে সাধারণত বড় অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে একটি শাখাতেই মোট ঋণের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিতরণ হয়। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় শাখায় একাই মোট ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ রয়েছে। এ কারণে আগে এই শাখায় চলতি মূলধনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ কোটি এবং অন্য চার শাখায় ২০ কোটি টাকার ঋণসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
গত ৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক স্থানীয় কার্যালয় শাখার ঋণসীমা ৫ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা করেছিল। তবে তখন শর্ত দেওয়া হয়েছিল, এই অর্থায়ন মূলত কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি বিকল্প শিল্প, ওষুধ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কর্মসংস্থানমুখী উৎপাদন খাতে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
পরবর্তীতে ১৪ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে সোনালী ব্যাংকের এমডি উল্লেখ করেন, দ্রুত ঋণপ্রত্যাশী অধিকাংশ গ্রাহক এই পাঁচ শাখাতেই আসছেন। কিন্তু নির্ধারিত সীমার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। সেই আবেদনের পর গত মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে সীমা প্রত্যাহারের অনুমোদন দেয়।
ঋণসীমা কার্যকর থাকলেও চলতি বছরের মে মাসে স্থানীয় কার্যালয় শাখার মাধ্যমে আরহাম মাল্টি ট্রেডিংকে ৪০ কোটি এবং মুন্নু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফেব্রিকসকে ৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয় সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। তবে এসব ঋণ বিতরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ অনাপত্তি প্রয়োজন ছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুমোদনের জন্য আলাদা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাগবে না।
ব্যাংকের এমডি জানান, মুন্নু গ্রুপের ঋণটি আগেই অনুমোদিত হয়েছিল, তবে সে সময় বিতরণ করা যায়নি। আরহাম মাল্টি ট্রেডিংও একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখন নিয়ম অনুযায়ী তাদের অর্থায়ন সম্পন্ন করা যাবে।
আর্থিক অবস্থার দিক থেকেও সোনালী ব্যাংক বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৯৮৮ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায়। মুনাফার দিক থেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে এটি তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য আয় এসেছে। এছাড়া মূলধন ঘাটতি কিংবা নিরাপত্তা সঞ্চিতির সংকট নেই। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় সোনালী ব্যাংক এগিয়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত বেড়ে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা এবং ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকায়। যদিও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১৮ শতাংশ। হল-মার্ক, বেক্সিমকো, থারমেক্স ও ওরিয়নের মতো কয়েকটি বড় গ্রুপের ঋণ এখনো খেলাপি তালিকায় থাকায় এ হার দ্রুত কমছে না। তবে ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত এখনও ৫৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
























