ঢাকা   মঙ্গলবার ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

উদয়ন স্কুলে এআই দিয়ে ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগ, বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা

গ্রামবাংলা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২০:৫৬, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২১:১০, ৩ নভেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

উদয়ন স্কুলে এআই দিয়ে ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগ, বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আপত্তিকরভাবে বিকৃত করা, অশ্লীল বার্তা পাঠানো এবং ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েছে ১০ শিক্ষার্থী। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা।

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিন হওয়ায় বিদ্যালয় প্রশাসন শুরু থেকেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। তারা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিচার চেয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে শিক্ষার্থীরা। তবে তাদের আটকে রাখতে শ্রেণিকক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তালা ভেঙে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ করে তারা। এ সময় ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ এবং ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের বাবা কি রিকশাওয়ালা?’—এমন লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিভিন্ন স্লোগান দেয় শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—বিদ্যালয়ের ভেতরে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের হয়রানি-হুমকি বন্ধ করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ডিনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।

দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির অভিযোগ

বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে কয়েকজন ছাত্রী জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে নারী সহপাঠীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে আসছে। সম্প্রতি কয়েকজন ছাত্রীর আপত্তিকর ছবি তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এতে তারা আতঙ্কিত। এর আগে দুবার অভিযোগ জমা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় তারা। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগ জানাতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী ছাত্রী জানায়, চার বছর ধরে তাকে বিরক্ত করছে ওই শিক্ষার্থী। একাধিকবার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার পাশাপাশি বন্ধুদের কাছে তার সংবেদনশীল অঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করেছে। বিষয়টি শিক্ষকদের জানাতে চাইলেও সাহস পায়নি সে।

ওই ছাত্রী আরও জানায়, তার আপত্তিকর ছবি তৈরি করে বাইরের স্কুলগুলোতেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বার্তা আসছে, যা তাকে বিব্রত ও আতঙ্কিত করছে।

আরেক ভুক্তভোগী ছাত্রী জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সহপাঠীদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে এবং আপত্তিকর বার্তা পাঠায়। তাদের কয়েকজন বন্ধুকে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা একাধিকবার ঘটলেও শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে দাবি তার।

প্রতিবাদ করায় ১০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

বিক্ষোভকারী এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম দিকে একদিন ক্লাস শেষে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় তার মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিকৃত ছবি এবং সংশ্লিষ্ট বার্তা মুছে ফেলতে বলা হয়। একপর্যায়ে তাকে থাপ্পড় দিয়ে সতর্কও করা হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবি, ৭ অক্টোবর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা—যিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন—এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন সহকারী প্রক্টর বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। পরদিন ৮ অক্টোবর পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষকেরা ১০ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে একটি কক্ষে নিয়ে আটকে রাখেন। সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত তাদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। এ ছাড়া অভিযোগের পক্ষে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষিত একটি মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয় বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

তাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় প্রথমে ওই ১০ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা ও ক্লাস থেকে বিরত রাখা হয়। অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে পরে আলাদা কক্ষে তাদের পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পূজার ছুটিসহ মোট ২৫ দিন তারা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত ছিল।

এ ছাড়া প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে টিসি বা ছাড়পত্র দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। তদন্তের নামে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে অপহরণ ও গুরুতর মারধরের অভিযোগসংবলিত একটি কাগজে তাদের জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাদের।

শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেছে, এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবারকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর মা ও পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। অন্য ভুক্তভোগীদের পরিবারকেও বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি।

তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনার তদন্তে বিদ্যালয় প্রশাসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর এ কে এম নূর আলম সিদ্দিকী ও এনামুল হক সজীবকে নিয়ে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটির সদস্যদের সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পরিবারের সংশ্লিষ্টতার প্রেক্ষাপটে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ডিনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

যা বলছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

সার্বিক বিষয়ে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, তদন্তের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরে রাখা হয়েছে। তাদের শিখন ঘাটতি তৈরি হলে তা পূরণ করে দেওয়া হবে।

তদন্ত কমিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনাস্থার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। আমি আজকেই ভিসি স্যারের কাছে যাব। এ বিষয়ে পুনরায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত রিপোর্ট আসার পর কোনো আপত্তি থাকলে শিক্ষার্থীরা জানাতে পারবে। কোনো ধরনের অবিচার হতে দেব না। এখানে কারও হস্তক্ষেপেরও সুযোগ নেই।’

ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, কোনো কোনো পরিবারকে এ ধরনের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হবে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একটি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন, তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উল্টো তাঁর দাবি, গত ৭ অক্টোবর কয়েকজন সহপাঠী তাঁর ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে তুলে নিয়ে মারধর করেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবার বক্তব্যের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করার বিষয়টিও এখন আলোচনায় এসেছে।

সর্বশেষ