শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) আগের বছরের তুলনায় ১২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২৯৩ শতাংশ। পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও উন্নতি হয়েছে।
আর্থিক সূচকে এমন ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ডসহ মোট ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। এদিকে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ৩২ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বোনাস শেয়ারের অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি আইপিওর অব্যবহৃত প্রায় ৬৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ের সময়সীমা আরও ১৮ মাস বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১২৪ শতাংশ
কোম্পানিটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪ টাকা ৬৮ পয়সা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ আয় ছিল ২ টাকা ৯ পয়সা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ২ টাকা ৫৯ পয়সা বা প্রায় ১২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। ফলে আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
শেয়ারপ্রতি আয়ের পাশাপাশি কোম্পানিটির নিট সম্পদমূল্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষে পুনর্মূল্যায়ন উদ্বৃত্তসহ শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ৫৮ টাকা ১৮ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৪ টাকা ৮ পয়সা। সেই হিসাবে এক বছরে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য বেড়েছে ৪ টাকা ১০ পয়সা।
অন্যদিকে, পুনর্মূল্যায়ন উদ্বৃত্ত ছাড়া শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৪ টাকা ৯৮ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪০ টাকা ৮৫ পয়সা। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও এক বছরে সম্পদমূল্য বেড়েছে ৪ টাকা ১৩ পয়সা।
পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ২৯৩ শতাংশ
আলোচ্য অর্থবছরে কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রম থেকেও নগদ অর্থ প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) হয়েছে ৬ টাকা ৫৩ পয়সা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১ টাকা ৬৬ পয়সা।
সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ বেড়েছে ৪ টাকা ৮৭ পয়সা বা প্রায় ২৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
অর্থাৎ সমাপ্ত অর্থবছরে কোম্পানিটির মুনাফা, নিট সম্পদমূল্য এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকেই উন্নতি হয়েছে।
সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০% ডিভিডেন্ড
আর্থিক ফলাফলের পাশাপাশি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের পরিচালনা পর্ষদ।
কোম্পানিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উদ্যোক্তা ও পরিচালক ছাড়া অন্যান্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা এ ডিভিডেন্ড পাবেন। অর্থাৎ ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ১ টাকা নগদ এবং প্রতি ১০০টি শেয়ারের বিপরীতে ১০টি বোনাস শেয়ার পাবেন তারা।
কোম্পানিটির মোট শেয়ারসংখ্যা ১২ কোটি ২৩ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৫টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৪৯০টি শেয়ার। অন্যদিকে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে রয়েছে ৭ কোটি ২৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৫টি শেয়ার।
উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ারের বিপরীতে নগদ ডিভিডেন্ড দেওয়া হবে না। ফলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ হারে নগদ ডিভিডেন্ড বাবদ কোম্পানিটিকে মোট ৭ কোটি ২৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৫ টাকা বিতরণ করতে হবে।
তবে ঘোষিত ডিভিডেন্ড কার্যকরের জন্য বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
৩২ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে বোনাস শেয়ার
এদিকে, ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার দেওয়ার পেছনে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে কোম্পানিটি।
পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ৩২ তলাবিশিষ্ট একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে অর্থায়নের জন্য বোনাস শেয়ার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোম্পানির কারখানা ভবনের উন্নয়ন ও নির্মাণ, ডিপো এবং প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমেও অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং ব্যবসার পরিচালন মূলধনের চাহিদা পূরণেও বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে সংরক্ষিত মুনাফা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত বোনাস শেয়ার সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত মুনাফা বা রিটেইনড আর্নিংস থেকে দেওয়া হবে। মূলধনি সংরক্ষিত তহবিল, সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন সংরক্ষিত তহবিল কিংবা কোনো অবাস্তবায়িত মুনাফা থেকে এ বোনাস শেয়ার দেওয়া হবে না।
এ ছাড়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার আগের কোনো মুনাফা থেকে কিংবা পরিশোধিত মূলধন কমিয়ে বোনাস শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়নি। বোনাস শেয়ার বিতরণের পরও ডিভিডেন্ড-পরবর্তী সংরক্ষিত মুনাফা যাতে ঋণাত্মক না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
আইপিওর অব্যবহৃত ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ছে সময়
অন্যদিকে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের অব্যবহৃত অংশ ব্যয়ের সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের পরিচালনা পর্ষদ।
কোম্পানিটির তথ্য অনুযায়ী, আইপিও তহবিলের অব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ ৬৪ কোটি ৯৩ লাখ ৮২ হাজার ৫২৯ টাকা।
এই অর্থ ব্যবহারের জন্য ২০২৬ সালের ৬ মার্চ থেকে আরও দেড় বছর বা ১৮ মাস সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদনসাপেক্ষ।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, অব্যবহৃত আইপিও তহবিল গাজীপুরের টঙ্গীতে কারখানা ভবন নির্মাণ এবং নতুন প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপনের কাজে ব্যবহার করা হবে।
এ ক্ষেত্রে আইপিওর অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে বিএসইসির ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দেওয়া অনুমোদনপত্রের শর্তাবলি অনুসরণ করা হবে।
অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্ধারিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আইপিওর অব্যবহৃত অর্থ ব্যয়ের জন্য অতিরিক্ত ১৮ মাস সময় পাবে কোম্পানিটি।
এজিএম ২৪ ডিসেম্বর, রেকর্ড ডেট ২৪ নভেম্বর
ঘোষিত ডিভিডেন্ড অনুমোদনসহ অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আগামী ২৪ ডিসেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি।
সভাটি হাইব্রিড পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। তবে সভার নির্দিষ্ট স্থান পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।
এদিকে, ঘোষিত ডিভিডেন্ড পাওয়ার যোগ্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণ এবং এজিএমে অংশগ্রহণের জন্য আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬ রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের আর্থিক সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে ১২৪ শতাংশ এবং পরিচালন নগদ প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৯৩ শতাংশ। এর সঙ্গে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ডের সুপারিশ, ৩২ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ এবং আইপিওর অব্যবহৃত অর্থ ব্যবহারের সময় বাড়ানোর উদ্যোগ কোম্পানিটির আলোচিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
























