চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের মুনাফায় বড় পতন হয়েছে। শুধু তৃতীয় প্রান্তিকেই নয়, বছরের প্রথম নয় মাসেও কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কমেছে ৪২ শতাংশের বেশি। আগের বছরের এককালীন আয় না থাকা, আর্থিক আয় হ্রাস এবং পণ্য বিক্রি কমে যাওয়ায় মুনাফায় এই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে মুনাফা কমলেও পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) ঋণাত্মক অবস্থা কাটিয়ে ইতিবাচক হয়েছে। অন্যদিকে, ডিভিডেন্ড বিতরণ ও মুনাফা সঞ্চয় কমে যাওয়ায় শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও (এনএভি) অবনতি হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রকাশিত অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৮ টাকা ৫২ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ১২ টাকা ৮০ পয়সা।
সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ৪ টাকা ২৮ পয়সা বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
নয় মাসে মুনাফা কমেছে ৪২ শতাংশের বেশি
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফলও কোম্পানিটির মুনাফায় বড় পতনের চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১৮ টাকা ৮৫ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৩২ টাকা ৫৯ পয়সা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ১৩ টাকা ৭৪ পয়সা বা প্রায় ৪২ দশমিক ১৬ শতাংশ।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুনাফা কমার অন্যতম কারণ আগের বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত এককালীন আয়। ট্রেডমার্ক ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপরীতে প্রদেয় রয়্যালটিসংক্রান্ত দায় পুনর্মূল্যায়নের পর ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে এককালীন একটি লাভ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে আগের বছরের মুনাফা তুলনামূলক বেশি ছিল।
চলতি বছরের প্রতিবেদনে ওই এককালীন লাভের প্রভাব না থাকায় আগের বছরের সঙ্গে তুলনায় শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে। এর পাশাপাশি কোম্পানিটির আর্থিক আয় হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যবসা থেকেও মুনাফা কমেছে। এসব বিষয় সম্মিলিতভাবে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক ও প্রথম নয় মাসের আর্থিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মুনাফা কমলেও ঋণাত্মক থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ
মুনাফায় বড় পতনের বিপরীতে কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম নয় মাসে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের এনওসিএফপিএস হয়েছে ৩৮ টাকা ১৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই সূচক ছিল ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৭০ পয়সা।
সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহে ৫৪ টাকা ৮৭ পয়সার ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ আগের বছরের ঋণাত্মক অবস্থা কাটিয়ে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির পরিচালন নগদ প্রবাহ ইতিবাচক হয়েছে।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিট মুনাফা কমলেও পরিচালন নগদ প্রবাহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো পরিচালন কার্যক্রমে নগদ অর্থের বহির্গমন কমে যাওয়া।
বিশেষ করে আগের বছরের একই সময়ে ইউস্যান্স পে-অ্যাবল অ্যাট সাইট (ইউপিএএস) ঋণপত্রের অধিকাংশ দায় পরিশোধ করা হয়েছিল। ফলে ২০২৫ সালের তুলনীয় সময়ে পরিচালন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যয় হয়েছিল। চলতি বছরের প্রতিবেদনের সময়ে এ ধরনের নগদ অর্থের বহির্গমন তুলনামূলক কম থাকায় নিট মুনাফা কমার পরও পরিচালন নগদ প্রবাহে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে।
অর্থাৎ নগদ প্রবাহের ইতিবাচক পরিবর্তন মূলত আগের বছরের তুলনায় নগদ অর্থের বহির্গমন কমে যাওয়ার ফল; একে সরাসরি মুনাফা বা বিক্রয় বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ডিভিডেন্ড বিতরণ ও আয় কমায় এনএভিতে পতন
এদিকে, কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যেও উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৩ টাকা ১৫ পয়সা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে এই অঙ্ক ছিল ১১৬ টাকা ৩০ পয়সা।
সেই হিসাবে নয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে ২৩ টাকা ১৫ পয়সা বা প্রায় ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এনএভি কমার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ২০২৫ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ডিভিডেন্ড চলতি প্রতিবেদনের সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এতে কোম্পানিটির সংরক্ষিত সম্পদের পরিমাণে প্রভাব পড়েছে।
দ্বিতীয়ত, চলতি বছরে মুনাফা কম হওয়ায় সংরক্ষিত আয়ে নতুন করে অর্থ যোগ হওয়ার পরিমাণও কমেছে। ফলে ডিভিডেন্ড বিতরণ এবং মুনাফা সঞ্চয় কমে যাওয়া—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমেছে।
আর্থিক প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র
সব মিলিয়ে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে আগের বছরের এককালীন আয় না থাকা, আর্থিক আয় হ্রাস এবং বিক্রয় কমে যাওয়ায় প্রথম নয় মাসে শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে ৪২ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ইউপিএএস ঋণপত্রের দায় পরিশোধজনিত নগদ বহির্গমন কম থাকায় পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক থেকে ইতিবাচক হয়েছে।
তবে একই সময়ে ডিভিডেন্ড বিতরণ ও মুনাফা সঞ্চয় কমে যাওয়ার কারণে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও কমেছে। ফলে মুনাফা, নগদ প্রবাহ ও সম্পদমূল্যের এই ভিন্নমুখী প্রবণতা কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।






















