ঢাকা   সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তিন আসামির জবানবন্দি

আইফোনের লোভে অপ্রতিম হত্যার পরিকল্পনা, সাত দিন আগে শুরু যোগাযোগ

গ্রামবাংলা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২০:৩০, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২০:৩১, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আইফোনের লোভে অপ্রতিম হত্যার পরিকল্পনা, সাত দিন আগে শুরু যোগাযোগ

ছবি তোলা ও টিকটক বানানোর সূত্রে পরিচয়। এরপর ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি লোভ। সেই লোভ থেকেই ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তাঁর আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে তাঁকে আঘাত করা হয়।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে তিনজনের বক্তব্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। তবে হত্যার সময়ের ঘটনাক্রম এবং কে কখন কী করেছেন, সে বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আগেই হয়েছিল হত্যার পরিকল্পনা

তিন আসামির জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন তুহিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক করার জন্য অপ্রতিম তাঁদের সঙ্গে বের হতেন।

তুহিনের দাবি, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁর এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাঁদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির জবানবন্দিতেও ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় সে তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার ভাষ্য, তুহিনই আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

অন্য কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তাঁর এক বন্ধু তাঁকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিনজনের বক্তব্যে এই জায়গায় মিল রয়েছে—হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি; আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

টিকটকে যোগাযোগ, পরদিন দেখা

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তখন অপ্রতিম তাঁকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকের মাধ্যমে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন।

পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে তাঁদের কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়। অপ্রতিম তাঁর বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ছবি তোলা ও টিকটক তৈরির এই পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

আলাদা পথে পাহাড়ে যায় চারজন

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হয় বলে তুহিনের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে। এরপর তাঁকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তাঁর চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, দুপুরের পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে সে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগে ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও প্রায় একই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সেখানেই হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারেন। পরে বিকেল চারটার পর তাঁরা পাহাড়ে যান এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখেন।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়েছিল—তিন জবানবন্দিতেই এ ধরনের বর্ণনা পাওয়া গেছে।

প্রথমে নেওয়া হয় আইফোন

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর ফোনটি সে তুহিনের হাতে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য এসেছে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশের আগের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।

তিন আসামির জবানবন্দিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। প্রথমে তাঁকে থাপ্পড় মারা হয়। এরপর পাশে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্যেও তুহিনের হাতে কোদালের হাতল দিয়ে প্রথম আঘাতের কথা এসেছে। তৃতীয় কিশোরও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।

আইফোন বিক্রি করে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যার উদ্দেশ্য হিসেবেও আইফোনের বিষয়টি উঠে এসেছে। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁদের লোভ হয়েছিল।

দ্বিতীয় কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, আইফোনটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যেও আইফোন বিক্রির পর অর্থ ভাগ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

হত্যার পর কে কোথায়

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আসামিরা কে কোথায় গিয়েছিল, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। দ্বিতীয় কিশোরের বক্তব্য, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর সে ও আরেক কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়, আর তুহিন সেখানে ছিলেন।

তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিনজনের বক্তব্যেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

সিয়ামকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

তুহিনের জবানবন্দিতে তাঁর বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও তথ্য এসেছে। তুহিনের দাবি, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাঁকে পুরো ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার কথা সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।

পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন।

পরদিনও অপ্রতিমকে খুঁজতে যায়

জবানবন্দিতে হত্যার পরদিন আসামিদের আচরণের কথাও উঠে এসেছে। তুহিন বলেছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাঁকে ফোন করে খোঁজ নেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে তাঁকে খুঁজতে বের হয়। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।

এরই মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্ত শেষে বিচারের অপেক্ষা

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানায়, তাঁদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তিন আসামির জবানবন্দি পাশাপাশি রাখলে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁদের পরিচয়, আইফোনের প্রতি আগ্রহ, পূর্বপরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং পরবর্তী হামলার ঘটনায় বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে কে কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

এখন অপ্রতিমের পরিবারের অপেক্ষা তদন্ত শেষ হয়ে মামলাটি বিচারে যাওয়ার। ছবি তোলার কথা বলে যে বিকেলে বাসা থেকে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী, সেই দিনের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দিকেই এখন নজর স্বজনদের।