শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য বাড়তি মুনাফা অর্জন। কিন্তু সেই মুনাফার আশায় নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি ঋণের টাকাও বিনিয়োগ করা কতটা যুক্তিযুক্ত? ঋণ করে বিনিয়োগ করলে লাভের সম্ভাবনা যেমন বাড়তে পারে, তেমনি লোকসানের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ঋণের সুদ বেশি হলে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার বড় অংশই চলে যেতে পারে সুদ পরিশোধে। তাই শেয়ারবাজারে ঋণ করে বিনিয়োগের আগে লাভ-লোকসানের হিসাব ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।
বিনিয়োগের জন্য নিজের পুঁজিই কেন ভালো?
শেয়ারবাজারের অপর নাম পুঁজিবাজার। পুঁজি বলতে বোঝায় নিজের মূলধন বা সঞ্চিত অর্থ, যা থেকে দৈনন্দিন ও মাসিক খরচ মেটানোর পর উদ্বৃত্ত থাকে। এই অর্থের একটি অংশ ঝুঁকি নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তবে এমন অর্থই বিনিয়োগ করা উচিত, যার ক্ষতি হলেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না।
আপনি নিশ্চয়ই নিতান্ত বাধ্য না হলে ঋণ করে সংসার চালান না কিংবা ঋণ নিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন না। তাহলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই বা ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কেন?
ঋণ নিলে তার বিপরীতে সুদ দিতে হয়। সেই সুদের অর্থ আসবে কোথা থেকে? আপনি শেয়ারবাজারে এসেছেন বাড়তি আয় বা মুনাফার আশায়। কিন্তু বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার বড় অংশ যদি ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগ কতটা লাভজনক?
প্রশ্নটি নিজেকেই করতে হবে।
লাভের সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে বাড়তি মুনাফা অর্জনের সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পুঁজি হারানোর ঝুঁকিও। ঋণ করে বিনিয়োগের পর যদি শেয়ারের দাম কমে যায়, তাহলে লোকসানের পাশাপাশি ঋণের সুদও বহন করতে হবে।
এমনকি বিনিয়োগের পুরো অর্থ হারিয়ে গেলেও ঋণ পরিশোধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। ফলে বিনিয়োগে লোকসান এবং ঋণের বোঝা—দুই দিক থেকেই বিপদে পড়তে পারেন বিনিয়োগকারী।
এ কারণে ঋণ পরিহার করে নিজের সঞ্চয়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করাই তুলনামূলক নিরাপদ। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এমন কোম্পানির শেয়ার বেছে নেওয়া উচিত, যেগুলোর ব্যবসা ও আর্থিক ভিত্তি ভালো এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতা রয়েছে।
আমাদের শেয়ারবাজারে এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যাদের গত পাঁচ থেকে দশ বছরের শেয়ারদর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দাম একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে অতীতের শেয়ারদরের এমন প্রবণতা ভবিষ্যতে পুঁজি সুরক্ষিত থাকার নিশ্চয়তা দেয় না। ভালো কোম্পানির শেয়ারেও লোকসান হতে পারে।
ভালো শেয়ার তুলনামূলক কম দামে কিনলেও ঋণ করে বিনিয়োগ করলে মুনাফার একটি অংশ সুদ পরিশোধে চলে যাবে। ফলে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের খরচ কত?
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত সরাসরি ঋণ দেয় না। তবে ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে কিংবা পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে ধার করে কেউ কেউ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন।
এ ছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বিনিয়োগকারীদের ঋণ দেয়। ফলে ঋণের সুদের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ঋণের সুদ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বিনিয়োগের প্রকৃত ব্যয় কত হচ্ছে, তা আগে হিসাব করা জরুরি। সুদের হার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হলে বিনিয়োগকারীকে শুধু ঋণের খরচ পুষিয়ে নিতেই উল্লেখযোগ্য মুনাফা করতে হবে। এর সঙ্গে লেনদেনের খরচ ও অন্যান্য ব্যয়ও যুক্ত হবে।
অর্থাৎ ঋণ করে বিনিয়োগ করলে লাভের হিসাব করতে হবে সুদ ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে।
এক লাখ টাকার বিনিয়োগে লাভের হিসাব
ধরা যাক, আপনি ঋণ করে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। অন্য একজন নিজের সঞ্চয় থেকে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। আপনারা দুজনই একই কোম্পানির শেয়ার কিনলেন, যার দাম ১০০ টাকা।
পরে শেয়ারটির দাম বেড়ে ১১০ টাকা হলো। অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ১০ টাকা বা ১০ শতাংশ।
এ অবস্থায় দুজনেরই বিনিয়োগের বাজারমূল্য দাঁড়াবে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু আপনার বিনিয়োগের সঙ্গে ঋণের সুদ যুক্ত হবে। অন্যদিকে নিজের অর্থ বিনিয়োগকারীকে ঋণের সুদ দিতে হবে না।
ধরা যাক, ঋণের সুদ ১৫ শতাংশ এবং এক বছর পর শেয়ার বিক্রি করা হলো।
| বিষয় | ঋণ করে বিনিয়োগ | নিজের অর্থে বিনিয়োগ |
|---|---|---|
| প্রাথমিক বিনিয়োগ | ১,০০,০০০ টাকা | ১,০০,০০০ টাকা |
| শেয়ার বিক্রির অর্থ | ১,১০,০০০ টাকা | ১,১০,০০০ টাকা |
| ঋণের সুদ | ১৫,০০০ টাকা | ০ টাকা |
| সুদ বাদে নিট মুনাফা | -৫,০০০ টাকা | ১০,০০০ টাকা |
এ হিসাব থেকে বোঝা যায়, শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ বাড়লেও ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে সুদ পরিশোধের পর লোকসান হতে পারে। অন্যদিকে নিজের অর্থ বিনিয়োগকারী ১০ হাজার টাকা মুনাফা করতে পারেন। এখানে লেনদেনের খরচ ও কর বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়া ঋণ করে বিনিয়োগ নয়
শেয়ারবাজারে ঋণ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। শেয়ারের দাম বাড়লে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভের পরিমাণ বাড়তে পারে। কিন্তু দাম কমলে লোকসানও বাড়ে। ঋণের সুদ, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা এবং জামানতসংক্রান্ত শর্ত বিনিয়োগকারীকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
তাই শেয়ারবাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা, পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতা না থাকলে ঋণ করে বিনিয়োগ করা উচিত নয়।
মনে রাখতে হবে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে নিজের পুঁজির ভিত্তি মজবুত করা জরুরি। ঋণ করে বড় বিনিয়োগের পরিবর্তে নিজের সঞ্চয় থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ বাড়ানোই হতে পারে তুলনামূলক বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
























