দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটলে আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই বাংলাদেশ সফরে আসতে পারে ভারতীয় ক্রিকেট দল। সফরে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) মধ্যে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। দুই বোর্ড জানুয়ারির প্রথম ভাগে সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিসিবির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিরিজটি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শুরু হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দুই দেশের সরকারের চূড়ান্ত সম্মতি এবং সফরের আনুষ্ঠানিক সূচি এখনো বাকি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বলেন, ‘আমরা একটা উইন্ডো (সময়) নিয়ে আলোচনা করছি। বিসিসিআইয়ের সঙ্গে আমাদের আলোচনা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আমি আশাবাদী, ভারতীয় দল সিরিজটি খেলতে বাংলাদেশে আসবে। দুই বোর্ড ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে।’
তবে সিরিজের নির্দিষ্ট তারিখ এখনই জানাতে রাজি হননি তিনি।
বিসিবি সূত্র জানায়, গত ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বোর্ডের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ভারত সফর নিয়ে বিসিসিআইয়ের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরেন সভাপতি তামিম ইকবাল। সেখানে জানানো হয়, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সিরিজ শুরু হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে।
সিরিজটি নিয়ে দুই বোর্ডের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। আইসিসি ও এসিসির সভায় যোগ দিতে গিয়ে বিসিসিআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও করেছেন বিসিবি সভাপতি। সর্বশেষ এক ভার্চুয়াল বৈঠকে জানুয়ারির শুরুতে সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হন দুই বোর্ডের কর্মকর্তারা। জানুয়ারিতে ভারতের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি থাকায় মাসের প্রথম ভাগকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুই দেশের সরকারের সম্মতিও প্রয়োজন
বিসিবি ও বিসিসিআই একমত হলেও ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরের ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকারের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে আগেও সিরিজটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এবারও সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান প্রয়োজন হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিসিসিআই যেহেতু আমাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সিরিজের সময়ের ব্যাপারেও মোটামুটি একমত হয়েছে, আমরা ধরে নিচ্ছি তাদের (ভারত) সরকার এ ব্যাপারে ইতিবাচক। এ বিষয়ে আমরাও আমাদের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি এবং ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।’
জানুয়ারিতে সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেভাবেই সব এগোচ্ছে।’
ভারতীয় দলের সফর নিয়ে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে। সম্প্রতি মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ পরিদর্শনে গিয়েও এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘আমরা খেলাধুলাকে সব সময় রাজনীতির বাইরে রাখতে চাই। আমরা চাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠুক এবং এই সম্পর্ক যেন জোরদার থাকে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি আমরা আন্তরিকভাবে দেখছি। আমরা চাই তারা এসে আমাদের দেশে খেলুক এবং আমরাও তাদের দেশে গিয়ে খেলতে চাই।’
ভারতীয় দল জানুয়ারিতে আসবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জানুয়ারি মাসে সিরিজ আয়োজনের একটা আলোচনা চলছে। তবে আমার জানামতে সময়টা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
বিসিসিআইয়ের ইতিবাচক অবস্থান সম্পর্কে বিসিবির এক পরিচালক বলেন, ‘তাঁরা যদি ইতিবাচক না থাকতেন, তাঁরা এটা নিয়ে আলোচনা করতেন না, জুম মিটিং করতেন না, নতুন তারিখ বের করতেন না। বাংলাদেশে না এলে তাঁদের তো দরকার নেই এগুলো করার!’
ভারত সরকারের সঙ্গে বিসিসিআইয়ের আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, বিসিসিআই তাদের সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে, নয়তো তারা এগোত না।’
দুইবার পিছিয়েছে ভারতীয় দলের সফর
ভারতীয় দলের এই সফরের সূচি এর আগে দুইবার নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির কারণে কোনোবারই সিরিজটি মাঠে গড়ায়নি।
তিন ওয়ানডে ও তিন টি-টোয়েন্টির সিরিজের সূচি প্রথম ঘোষণা করা হয় গত বছরের ১৫ এপ্রিল। তখন বিসিবি সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন আমিনুল ইসলাম। সূচি অনুযায়ী, গত বছরের ১৩ আগস্ট ভারতীয় দলের বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। মিরপুরে ১৭ ও ২০ আগস্ট দুটি ওয়ানডে এবং ২৩ আগস্ট চট্টগ্রামে তৃতীয় ওয়ানডে হওয়ার কথা ছিল। এরপর ২৬ আগস্ট চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টি এবং ২৯ ও ৩১ আগস্ট মিরপুরে শেষ দুটি ম্যাচ হওয়ার সূচি ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় দল বাংলাদেশ সফরে আসেনি। গত বছরের ৫ জুলাই বিসিবি ও বিসিসিআই যৌথভাবে সিরিজ স্থগিতের ঘোষণা দেয়। যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি ও দুই দলের সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এরপর চলতি বছরের ২ জানুয়ারি বিসিবি ঘোষিত ২০২৬ সালের হোম সিরিজের সূচিতেও ভারত সফরের সময় রাখা হয় সেপ্টেম্বরে। সূচি অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট ভারতীয় দলের বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। ১, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর তিনটি ওয়ানডে এবং ৯, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর তিনটি টি-টোয়েন্টি আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল।
সম্ভাব্য এই সিরিজকে সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ মৌসুমের জন্য মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিল বিসিবি।
তবে বিসিবি সূচি ঘোষণা করলেও বিসিসিআই কখনোই সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেয়নি। সে সময় বিসিসিআইয়ের একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিল, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি ও নির্দেশনা নিয়েই বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরেও সিরিজটি হয়নি। তবে এবার সিরিজ স্থগিত বা বাতিলের বিষয়ে কোনো বোর্ড আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। গত ৩১ আগস্ট বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জানিয়েছিলেন, দুই বোর্ডই সিরিজ আয়োজনের ব্যাপারে আন্তরিক এবং নতুন সময় নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও দুই বোর্ডের সর্বশেষ অবস্থান স্পষ্ট ছিল না।
আর্থিক ও ক্রীড়াঙ্গনের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভারত সিরিজ
ভারতের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন যেকোনো ক্রিকেট বোর্ডের জন্যই আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক নৈকট্য ও বিপুল দর্শক আগ্রহের কারণে এর গুরুত্ব আরও বেশি। ভারতের বিপক্ষে সিরিজ মানেই স্পনসরদের আগ্রহ, টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব থেকে আয় এবং গ্যালারিতে দর্শকের উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা।
বিসিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সব দেশের জন্যই এখন দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন করাটা আর্থিকভাবে অলাভজনক। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা—সবাই লস করে। ২০২২ সালের পর টিভি সম্প্রচারের চুক্তির অঙ্কগুলো বিশ্বব্যাপীই মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একমাত্র ভারতের বিপক্ষে সিরিজই সব দেশের জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক। সেদিক থেকে চিন্তা করলেও ভারত সিরিজ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
এ ছাড়া ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশে আইসিসি ও এসিসির কয়েকটি বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে ভারতের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ, জুন-জুলাইয়ে ছেলেদের এশিয়া কাপ এবং ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে আয়োজন করবে।
বিসিবির ধারণা, জানুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ সফলভাবে আয়োজন করা গেলে ভবিষ্যতের এসব আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও ভারতের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও সিরিজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারত সফর সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু বিসিবির
ভারতীয় জাতীয় দলের সম্ভাব্য সফরকে সামনে রেখে প্রস্তুতিও শুরু করেছে বিসিবি। জানুয়ারির আগে চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ ক্রিকেট। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতীয় নারী দলও এ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এ আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিসিবি।
এদিকে ঘরোয়া ক্রিকেটের ডমেস্টিক থ্রি টুর্নামেন্টের ফাইনাল হওয়ার কথা ৩১ ডিসেম্বর। গত ২৮ অক্টোবরের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল নির্দেশনা দিয়েছেন, ফাইনাল কোনোভাবেই এর পরে আয়োজন করা যাবে না। ১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সূচিতেও অন্য কোনো ব্যস্ততা রাখা যাবে না।
সভায় উপস্থিত এক বোর্ড পরিচালক বলেন, ‘ভারত সিরিজকে মাথায় রেখেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সব মিলিয়ে দুই দেশের বোর্ডের আলোচনা, সরকারের ইতিবাচক অবস্থানের প্রত্যাশা এবং বিসিবির প্রস্তুতিতে জানুয়ারিতে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সফরের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা মিলবে দুই দেশের প্রয়োজনীয় সম্মতি ও আনুষ্ঠানিক সূচি ঘোষণার পর।
























