ঢাকা   শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

ব্যাংকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে অনড় বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিচালকদের মেয়াদ ৬ বছর করার প্রস্তাব

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:১৩, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

ব্যাংকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে অনড় বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিচালকদের মেয়াদ ৬ বছর করার প্রস্তাব

ব্যাংকিং খাতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং পরিচালকদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা সীমিত করতে নতুন সংস্কার প্রস্তাবে অনড় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক মালিকদের বিরোধিতা সত্ত্বেও একটি ব্যাংকের পর্ষদে একই পরিবারের সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ দুজন এবং পরিচালকদের টানা মেয়াদ ছয় বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খেলাপি ঋণের বোঝা ও ব্যাংক লুটের ঝুঁকি কমাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে অর্থ বিভাগে পাঠানো ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া সংশোধনীতে এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে পরিচালকদের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত তিন বছরের বিরতি বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা খসড়াতেও পারিবারিক সদস্য সংখ্যা ও পরিচালকদের মেয়াদ কমানোর প্রস্তাব ছিল। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অবস্থানই বহাল রেখেছে।

পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব

নতুন খসড়ায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সর্বোচ্চ ২০ জন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা দুই থেকে বাড়িয়ে পাঁচ করার কথা বলা হয়েছে।

আগের খসড়ায় পর্ষদের সদস্য সংখ্যা ১৫-তে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি পর্ষদের অন্তত অর্ধেক আসন স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছিল।

নতুন প্রস্তাবে এই বিধান শিথিল করা হয়েছে। ফলে পর্ষদ গঠনে ব্যাংক মালিকদের নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় বেশি থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পরিচালকদের যোগ্যতায় কঠোরতা

ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার শর্ত আরও কঠোর করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সীমা শিথিল করার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের স্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই ছাড় দিতে পারবে। এতে বড় দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।

খেলাপি ঋণ ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ

ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় এই সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে। মুডি’স রেটিংসের ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ খেলাপি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকের মালিকানা ও ঋণ বিতরণে কিছু পরিবার এবং করপোরেট গোষ্ঠীর অতিরিক্ত প্রভাব এই সংকটের অন্যতম কারণ। এসব গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে।

সংস্কারের বিরোধিতায় ব্যাংক মালিকেরা

ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরুদ্ধে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।

সংগঠনটির যুক্তি, পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমালে দীর্ঘদিনের মালিকানা কাঠামো ভেঙে পড়বে। পরিচালকদের মেয়াদ কমালে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হবে। আর স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ালে ব্যাংকের ওপর মালিকদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ব্যাংক মালিকেরা পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন সদস্য রাখার এবং পরিচালকদের মেয়াদ নয় বছর করার দাবি জানান।

সংসদে বিল উত্থাপনের লক্ষ্য

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে খসড়াটি পর্যালোচনা করা হবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন ও পাস করাই সরকারের লক্ষ্য।

ব্যাংকিং সংকটে বাড়ছে সরকারি ব্যয়

ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। সংকটাপন্ন পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন ব্যাংকটিতে ইতিমধ্যে বাজেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়া হয়েছে।

গত ১০ অক্টোবর গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, ব্যাংক থেকে লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ধরে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিলের প্রয়োজন হবে।

মুডি’সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, পুরো ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন ও মূলধন জোগাতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।

পরিচালকদের মেয়াদ নিয়ে বারবার পরিবর্তন

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের নীতিমালাও বারবার বদলেছে।

২০১৮ সালে ব্যাংক মালিকদের চাপে পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে নয় বছর করা হয়। পরে ২০২৩ সালে আইন সংশোধন করে সেই মেয়াদ ১২ বছরে উন্নীত করে তৎকালীন সরকার।

এ নিয়ে সংসদে বিরোধিতা করেছিলেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। তাঁদের একজন ব্যাংক পরিচালকদের ‘ব্যাংক লুটের মূলহোতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

সর্বশেষ