দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আস্থা, বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক এবং আমানত সংগ্রহের সক্ষমতার কারণে ব্যাংকটি দেশের ব্যাংকিং খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে ব্যাংকটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটি কর-পরবর্তী নিট লোকসান করেছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ৭৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের অবনতি হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি ব্যাংকের এত বড় অঙ্কের লোকসান হলে তার প্রভাব কি শুধু শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সাধারণ আমানতকারীদেরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়? বিশেষ করে যেসব গ্রাহক জীবনের সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন কিংবা অবসরকালীন অর্থ ইসলামী ব্যাংকে জমা রেখেছেন, তাঁদের জন্য এই লোকসানের অর্থ কী?
ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লোকসানের পাশাপাশি সম্পদমূল্য, পরিচালন নগদ প্রবাহ এবং শেয়ারপ্রতি আয়েও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এসব সূচক ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করলেও শুধু লোকসানের অঙ্ক দিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না। তবে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গ্রাহকদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংকের প্রধান ব্যবসা হলো আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ ও বিনিয়োগে ব্যবহার করা। এসব ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় করে আমানতকারীদের মুনাফা বা সুদসদৃশ রিটার্ন এবং পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়। কিন্তু বড় অঙ্কের বিনিয়োগ খেলাপি হয়ে গেলে কিংবা বিনিয়োগের অর্থ আটকে গেলে ব্যাংকের প্রত্যাশিত আয় আসে না। একই সঙ্গে আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বাড়তে থাকলে ব্যাংকের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ে।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুমোদিত আর্থিক বিবরণীতেও এ ধরনের সমস্যার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার খেলাপি বিনিয়োগ, ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মাধ্যমে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের অর্থ আত্মসাৎ এবং এসব বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়ার কারণে লোকসান হয়েছে। অন্যদিকে আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ও আটকে থাকা বিনিয়োগ থেকে অর্থ আদায় না হলে ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। তখন গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন, বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলন কিংবা বিভিন্ন পরিশোধ কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে বর্তমানে এমন কোনো সার্বিক উত্তোলন সংকট তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য শুধু এই আর্থিক প্রতিবেদন যথেষ্ট নয়।
দ্বিতীয়ত, আমানতকারীরা তাঁদের জমা অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা কম পেতে পারেন। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুদারাবা নীতির আওতায় পরিচালিত আমানতের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আয় ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মুনাফা বণ্টন করা হয়। ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় কমে গেলে আমানতকারীদের প্রাপ্য মুনাফার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি আমানতকারীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় অঙ্কের লোকসান, খেলাপি বিনিয়োগ এবং নগদ প্রবাহে নেতিবাচক পরিস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে কিছু গ্রাহক নতুন করে আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। আবার বিদ্যমান আমানতকারীদের কেউ কেউ প্রয়োজনের আগেই অর্থ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যাংকটির আর্থিক সূচকেও অবনতির চিত্র স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ৫১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৪৯ পয়সা। সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ২০ টাকা ৪১ পয়সা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্যের পতন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর একক হিসাবে ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট সম্পদমূল্য কমেছে প্রায় ৩ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা।
শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও ৪৩ টাকা ২৫ পয়সা থেকে কমে ২২ টাকা ২৭ পয়সায় নেমেছে। সমন্বিত হিসাবে এই সম্পদমূল্য ৪৪ টাকা ৪৮ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ২৩ টাকা ৬৪ পয়সা।
এদিকে ব্যাংকটির পরিচালন নগদ প্রবাহও নেতিবাচক অবস্থায় চলে গেছে। প্রথম ৯ মাসে একক হিসাবে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ৫৪ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১১ টাকা ৮৯ পয়সা। সমন্বিত হিসাবে এই প্রবাহ ১২ টাকা ৪৪ পয়সা থেকে কমে ঋণাত্মক ৩৬ টাকা ১২ পয়সা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ব্যাংকের নিট লোকসান, সম্পদমূল্য কমে যাওয়া এবং পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হওয়া—প্রতিটি বিষয়ই আর্থিক দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই এককভাবে প্রমাণ করে না যে আমানতকারীরা তাঁদের জমা অর্থ হারাবেন। ব্যাংকের আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নির্ভর করে তারল্য, আদায়যোগ্য বিনিয়োগ, হাতে থাকা নগদ অর্থ, অন্যান্য সম্পদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও সহায়তার ওপর।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার অভিযোগ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। এরপর গ্রুপটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থের বড় অংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনায় পরিবর্তন আসে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব নিয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকটির আটকে থাকা বিনিয়োগের অর্থ কতটা উদ্ধার করা সম্ভব হবে, খেলাপি বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত সংস্থান রাখা হয়েছে কি না এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে কি না।
বিশেষ করে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটি নিয়মিত গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে পারছে কি না, আমানত ও উত্তোলনের মধ্যে ভারসাম্য কতটা বজায় থাকছে, বিনিয়োগ থেকে নগদ অর্থ আদায় হচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে আর্থিক পুনরুদ্ধারের কী অগ্রগতি হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকার লোকসান শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হিসাব নয়; এটি ব্যাংকটির আর্থিক পুনরুদ্ধার, আমানতকারীদের আস্থা এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তবে এই পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার চেয়ে প্রয়োজন স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, আটকে থাকা বিনিয়োগের অর্থ উদ্ধার এবং ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ, একটি ব্যাংকের সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে তখনই, যখন আর্থিক দুর্বলতার পাশাপাশি গ্রাহকদের আস্থাও হারিয়ে যায়।
























