শেয়ারবাজারকে শুধু শেয়ারনির্ভর না রেখে বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক পণ্যের মাধ্যমে বহুমুখী করতে গত পাঁচ মাসে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থির আয়ের বিকল্প ক্ষেত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ডের লেনদেন বাড়াতে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্ড ইস্যুর বিধিমালা সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
অনুমোদিত বন্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি জিরো-কুপন গ্রিন বন্ড। এ ছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, ব্যাংক এশিয়ার ৮০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাসটেইনেবল সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড এবং ওয়ান ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড অনুমোদন পেয়েছে।
বিএসইসির উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো শেয়ারবাজারে বন্ডের কার্যকর সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলা। এ জন্য অনুমোদিত বন্ডগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বন্ড কেনাবেচার সুযোগ পাবেন এবং প্রয়োজনে তুলনামূলক সহজে বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম গণমাধ্যমকে জানান, দেশের বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে এবারই প্রথম মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে বন্ডের তালিকাভুক্তি ফি কমানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
গতানুগতিক বন্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক বন্ড চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নারী ক্ষমতায়নে অর্থায়নের লক্ষ্যে সাজেদা ফাউন্ডেশনের ১৫৮ কোটি টাকার ‘অরেঞ্জ বন্ড’ অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। অন্যদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডের অর্থ পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ ও টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্ড মার্কেটে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড, পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে এসব তহবিলের বিনিয়োগের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মতো খাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
বিএসইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে শেয়ারবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের পাশাপাশি নির্দিষ্ট আয়ের বন্ডে বিনিয়োগ বৈচিত্র্য আনার সুযোগ পাবেন।
এ ছাড়া বন্ড লেনদেনের পৃথক প্ল্যাটফর্ম আরও সক্রিয় করা এবং বিদ্যমান ‘ডেট ইস্যু রুলস’ বা বন্ড ইস্যু বিধিমালা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বন্ড ইস্যু ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, সময় কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের শেয়ারবাজারে বন্ডের লেনদেন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস সম্প্রসারিত হবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারের পাশাপাশি স্থির আয়ের আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।
























