দেশের জীবনবিমা খাতে আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। ছয়টি জীবনবিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছরের মার্চ শেষে পুরো খাতে অনাদায়ী বিমা দাবির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছেই গ্রাহকদের পাওনা প্রায় ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। ফলে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও বিমার অর্থ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন বহু গ্রাহক।
বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ছয়টি জীবনবিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।
কোম্পানিটির লাইফ ফান্ডে ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ঘাটতি ৩২৭ কোটি টাকা, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৯৪ লাখ টাকা।
বিমা খাতে লাইফ ফান্ড হলো গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম ও সংশ্লিষ্ট তহবিলের হিসাব, যা ভবিষ্যতে বিমা দাবি পরিশোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো কোম্পানির এ তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়লে তার আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে শুধু লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হওয়াই কোম্পানিটির দেউলিয়াত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
বকেয়া বিমা দাবি ৪,৪১০ কোটি টাকার বেশি
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে জীবনবিমা খাতে অনাদায়ী বিমা দাবির পরিমাণ ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছেই গ্রাহকদের পাওনা প্রায় ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ধরে বিমার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও অর্থ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের। এতে তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে। একই সঙ্গে জীবনবিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিন ধাপে টাকা পেয়েছেন ১৬ হাজারের বেশি গ্রাহক
বকেয়া বিমা দাবি পরিশোধে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে আইডিআরএ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, তিন ধাপে মোট ১৬ হাজার ৫৮ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর তৃতীয় ধাপে ছয়টি বিমা কোম্পানির ৭ হাজার ৬৪১ জন গ্রাহকের অনুকূলে ২৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এর আগে প্রথম দুই ধাপে ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহককে দেওয়া হয়েছিল ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
তবে ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া দাবির তুলনায় বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ খুবই কম। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবি
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জীবনবিমা খাতের সংকট কাটাতে শুধু আংশিক অর্থ বিতরণ যথেষ্ট নয়। কোম্পানিগুলোর প্রকৃত সম্পদ ও দায় নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে গ্রাহকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও সময়সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বিমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ছয়টি কোম্পানির ঋণাত্মক লাইফ ফান্ড এবং হাজার হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী বিমা দাবি দেশের জীবনবিমা খাতের আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহক সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—গ্রাহকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
























