ঢাকা   সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

ব্রোকারেজ হাউসে অনিয়ম ঠেকাতে বিএসইসির নতুন পরিকল্পনা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭:০১, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

ব্রোকারেজ হাউসে অনিয়ম ঠেকাতে বিএসইসির নতুন পরিকল্পনা

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের টাকা ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসে অনিয়মের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো বিনিয়োগকারী। এবার এমন অনিয়ম আগেভাগে শনাক্ত করতে দেশের সব ব্রোকারেজ হাউসকে একটি সমন্বিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ ব্যবস্থা চালু হলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাংক হিসাব, গ্রাহকদের জমা অর্থ এবং শেয়ারের তথ্য একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

এক সফটওয়্যারে সব হিসাব

বর্তমানে দেশের ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি আলাদা সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ফলে গ্রাহকদের হিসাবে জমা থাকা অর্থের সঙ্গে ব্যাংকের প্রকৃত ব্যালেন্স কিংবা গ্রাহকদের শেয়ারের সঙ্গে ডিপোজিটরির তথ্য মিলিয়ে দেখতে সময় লাগে। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে এই জটিলতা কমবে বলে আশা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

অনিয়ম ধরা পড়বে দ্রুত

প্রস্তাবিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাংক হিসাব, কনসোলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্ট বা সিসিএ এবং শেয়ারসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো হিসাবে গরমিল দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। এতে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা শেয়ারের হিসাবে অসংগতি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিএসইসির পর্যালোচনা সভা

এ উদ্যোগের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সম্প্রতি বিএসইসির কার্যালয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় সফটওয়্যারটির প্রযুক্তিগত সুবিধা, বাস্তবায়ন ব্যয়, সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা ও সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়।

এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানও ব্রোকারেজ হাউসে জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ বন্ধে সমন্বিত প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাংক ব্যালেন্স ও গ্রাহকদের হিসাব নিয়মিত মিলিয়ে দেখা গেলে অর্থ তছরুপের ঘটনা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব।

ছয় প্রতিষ্ঠানে ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ব্রোকারেজ হাউসের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে ছয়টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে মশিউর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ১৬১ কোটি, তামহা সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ১৪০ কোটি, ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ১২৮ কোটি, সালতা ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ৬৫ কোটি এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে।

এসব ঘটনা বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাই অনিয়ম ঘটে যাওয়ার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিবর্তে শুরুতেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন ১৭ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী

অনিয়মের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ডিএসইর ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড থেকে ২৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এর মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৭২ কোটি টাকা ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা অর্থ আত্মসাৎ বন্ধের স্থায়ী সমাধান নয়।

বিনিয়োগকারীরা কী সুবিধা পাবেন?

প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের হিসাবের ব্যালেন্স ও শেয়ার ধারণের তথ্য আরও সহজে যাচাই করার সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত হলে এসএমএস বা ইমেইলের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কীভাবে চালু হবে, তা চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে।

বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও রয়েছে

একটি সমন্বিত সফটওয়্যার চালু করতে পুরোনো তথ্য নতুন ব্যবস্থায় স্থানান্তর, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণে বাড়তি ব্যয় হতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় সাইবার হামলা বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে একসঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে শক্তিশালী ব্যাকআপ সার্ভার, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা এবং স্বাধীন নিরীক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, বিএসইসির এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর হিসাব তদারকিতে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু সফটওয়্যার চালু করলেই বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না; এর কার্যকর প্রয়োগ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ