ঢাকা   মঙ্গলবার ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশে ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই কেন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন না?

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৫৮, ৪ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বাংলাদেশে ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই কেন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন না?

দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে ১৯ কোটিরও বেশি মানুষের। জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। অথচ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য থাকা বেনিফিশিয়ারি ওনার বা বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা মাত্র ১৭ লাখের মতো। এর অর্থ, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ করছেন জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষ।

বাস্তব চিত্র আরও ছোট। কারণ একজন ব্যক্তি একাধিক বিও অ্যাকাউন্টে শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা বন্ড রাখতে পারেন। ফলে বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে প্রকৃত শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২ লাখের বেশি নয়। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ০.১ শতাংশেরও কম মানুষ সরাসরি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছেন।

তাহলে প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের মানুষ কি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চান না, নাকি বাজারের প্রতি আস্থার সংকটই তাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে?

একসময় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ৩৩ লাখের বেশি

বাংলাদেশের মানুষ যে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী নন, বিষয়টি এমন নয়। এর বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১০ সালের আগে।

সে সময় বাজারে ব্যাপক উত্থানের মধ্যে দেশের বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালের ভয়াবহ দরপতনের পর বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা লাগে।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে কারসাজি, দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি, অনিয়ম এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির নানা ঘটনা সামনে আসায় নতুন বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ শেয়ারবাজার থেকে দূরে থেকেছেন।

আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা। একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের সঞ্চয়ের টাকা কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি আশা করেন—কোম্পানির আর্থিক তথ্য সঠিক থাকবে, বাজারে কারসাজি হবে না এবং অনিয়ম হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নেবে।

কিন্তু অতীতে এসব জায়গায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কিছু ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও ফান্ড ম্যানেজারের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে অনিয়ম বা তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা তাদের মূলধনও হারিয়েছেন।

এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি করেছে—শেয়ারবাজারে টাকা রাখলে সেটি নিরাপদ থাকবে তো?

আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আরেকটি বড় ভিত্তি হলো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন। বিনিয়োগকারী সাধারণত কোম্পানির আয়, মুনাফা, সম্পদ, ঋণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখে সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপন বা কারসাজির অভিযোগ উঠলে পুরো বাজারের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বিশেষ করে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোনো কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় আরও বাড়ে।

ভালো কোম্পানি থাকলেও ডিভিডেন্ডের নিশ্চয়তা নেই

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণ হলো ডিভিডেন্ড। কিন্তু অনেক কোম্পানি পর্যাপ্ত মুনাফা করার পরও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নগদ লভ্যাংশ দেয় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ফলে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী যখন ব্যাংক আমানত বা অন্য কোনো তুলনামূলক স্থিতিশীল বিনিয়োগ থেকে নির্দিষ্ট আয় পাওয়ার সুযোগ দেখেন, তখন শেয়ারবাজারের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

‘জাঙ্ক’ শেয়ারে কারসাজি আরও বড় সমস্যা

বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেক সময় স্বল্প মূল্যের দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেন ও দরবৃদ্ধি দেখা যায়।

এ ধরনের শেয়ারকে ঘিরে কারসাজির অভিযোগও রয়েছে। এতে স্বল্প সময়ে লাভের আশায় কিছু বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের লোকসানে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ফলে সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ারবাজারের একটি নেতিবাচক চিত্র তৈরি হয়—এটি কি বিনিয়োগের জায়গা, নাকি কারসাজির বাজার?

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিএসইসির বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা না করার অভিযোগ উঠেছে।

মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানো থেকে শুরু করে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানির আইপিও অনুমোদন—বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাজারে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জালিয়াতির শিকার বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ এবং বিএসইসির নতুন কমিশনের সংস্কার পরিকল্পনাকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

সামনে কী করতে হবে?

শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আনতে শুধু সূচক বাড়ানো বা লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আস্থা তৈরির মতো একটি টেকসই বাজারব্যবস্থা।

প্রথমত, ভালো ও শক্তিশালী কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। দুর্বল কোম্পানির প্রবেশ ঠেকাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শেয়ারবাজারের পাশাপাশি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য কোম্পানিগুলো শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

তৃতীয়ত, সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ারদর কারসাজি, গুজবনির্ভর লেনদেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

চতুর্থত, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, করপোরেট গভর্ন্যান্স ও তথ্য প্রকাশের মান নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাজারের সূচক বা লেনদেনের আকার কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেষ্টা না করে বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা।

১০০ জনের ৯৯ জনকে বাজারে আনতে হলে

বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে যদি প্রকৃত বিনিয়োগকারী মাত্র কয়েক লাখ হন, তাহলে সমস্যাটি শুধু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর ঘাটতি নয়; এটি আসলে আস্থার ঘাটতির প্রতিচ্ছবি।

একসময় যেখানে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়েছিল, সেখানে এখন প্রকৃত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা যদি কয়েক লাখে নেমে আসে, তাহলে বোঝা যায়—মানুষের সঞ্চয় আছে, বিনিয়োগের সক্ষমতাও আছে; কিন্তু সেই অর্থ শেয়ারবাজারে আনতে হলে আগে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে—কীভাবে নতুন বিনিয়োগকারীকে শেয়ারবাজারে আনা যাবে?

এর উত্তর শুধু নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার মধ্যে নেই। উত্তর রয়েছে এমন একটি বাজার তৈরিতে, যেখানে বিনিয়োগকারী বিশ্বাস করবেন—তার টাকা, তার অধিকার এবং তার বিনিয়োগের নিরাপত্তা সত্যিই সুরক্ষিত।

আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন ও বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহে সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের জন্য সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বার্তা।

সর্বশেষ