ঢাকা   শনিবার ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

৩০ লাখ শেয়ার হস্তান্তরে বিএসইসির নির্দেশ

ডোমিনেজ স্টিলের মালিকানা বদলে সংকট কাটানোর উদ্যোগ, ৩০ লাখ শেয়ার হস্তান্তরে বিএসইসির নির্দেশ

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৫, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ডোমিনেজ স্টিলের মালিকানা বদলে সংকট কাটানোর উদ্যোগ, ৩০ লাখ শেয়ার হস্তান্তরে বিএসইসির নির্দেশ

দীর্ঘদিনের আর্থিক ও পরিচালনাগত সংকটে থাকা ডোমিনেজ স্টিলকে ঘুরে দাঁড় করাতে মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন—বিএসইসি। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে থাকা ৩০ লাখ ৭৮ হাজার শেয়ার নতুন মালিকদের নামে আগামী সাত দিনের মধ্যে হস্তান্তর সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ—ডিএসইকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি শুধু শেয়ার হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন মালিকপক্ষ পুরোনো মালিকদের সম্পূর্ণ শেয়ার কিনে নিয়ে কোম্পানির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও গ্রহণ করবে। অর্থাৎ, ডোমিনেজ স্টিলের মালিকানা বদলের মাধ্যমে মূলত সংকটে থাকা কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ডিএসইকে পাঠানো চিঠিতে বিএসইসি জানিয়েছে, বর্তমানে শেয়ার হস্তান্তরে প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞা বা ‘প্রোহিবিটরি পিরিয়ড’ থাকলেও এই বিশেষ লেনদেন সম্পন্ন করতে আইনি বাধা থাকবে না। কারণ, এটি সাধারণ বাজারে শেয়ার বিক্রির মতো কোনো লেনদেন নয়; বরং বিদ্যমান মালিকদের কাছ থেকে নতুন মালিকদের কাছে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের অংশ।

তবে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় শেয়ারগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ‘লক-ইন’ থাকবে। অর্থাৎ নতুন মালিকরা শেয়ার হাতে পাওয়ার পরই ইচ্ছামতো বাজারে বিক্রি করে বের হয়ে যেতে পারবেন না। এর ফলে মালিকানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বড় ধরনের শেয়ার সরবরাহ তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

কেন এই মালিকানা পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?

ডোমিনেজ স্টিল দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক দুর্বলতা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

শুধু রাজস্ব কমেনি, একই সময়ে কোম্পানিটি ৯৪ লাখ টাকা নিট লোকসান করেছে। ফলে শেয়ারপ্রতি লোকসান বা ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৯ পয়সায়।

সহজ উদাহরণে বলা যায়, একটি কোম্পানির বিক্রি যদি এক বছরে ১০ কোটি টাকা থেকে কমে প্রায় ৫ কোটি টাকায় নেমে আসে, অথচ পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য খরচের বড় অংশ থেকেই যায়, তাহলে লাভের পরিবর্তে লোকসান হওয়ার চাপ তৈরি হয়। ডোমিনেজ স্টিলের সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্রেও এমন চাপেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

কারখানা নিয়েও তৈরি হয়েছিল প্রশ্ন

কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও এর আগে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ডিএসইর একটি পরিদর্শন দল নরসিংদীতে ডোমিনেজ স্টিলের কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে সেটি বন্ধ অবস্থায় পায়।

তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল, সাভারের ইউনিট চালু রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডোমিনেজ স্টিলের ব্যবসা মূলত প্রকল্পভিত্তিক হওয়ায় সব কারখানায় সবসময় টানা উৎপাদন চালু রাখার প্রয়োজন হয় না।

অর্থাৎ, কোম্পানির পক্ষ থেকে কার্যক্রমের ধরনকে কারখানা বন্ধ থাকার একটি কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে উৎপাদন, রাজস্ব ও মুনাফার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকে।

মালিকানা বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আগেই

ডোমিনেজ স্টিলের মালিকানা পরিবর্তনের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। গত ২৭ আগস্ট বিএসইসি শর্তসাপেক্ষে কোম্পানিটির প্রায় ৩০ শতাংশ বা ৩ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার আকিজ রিসোর্সেস লিমিটেড, শেখ জসিম উদ্দিন ও ফারিয়া হোসেনের নামে হস্তান্তরের প্রাথমিক অনুমোদন দেয়।

প্রস্তাবিত লেনদেনটি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড—সিডিবিএলের বাই-ল ১১.৬ অনুযায়ী অফ-মার্কেট আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এর আগে চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল ডোমিনেজ স্টিলের পরিচালনা পর্ষদ শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল।

তবে সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষেধাজ্ঞা বা সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধের কারণে লেনদেনটি বাস্তবায়নে ডিএসই বিএসইসির কাছে ব্যাখ্যা চায়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ডিএসইর পাঠানো চিঠির জবাবে কমিশন জানায়, বিশেষ এই লেনদেনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিলযোগ্য।

এখন মূল প্রশ্ন পুনরুদ্ধার নিয়ে

বিএসইসির সর্বশেষ নির্দেশনার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পথ আরও পরিষ্কার হলো। নতুন মালিকরা শেয়ার হস্তান্তরের পাশাপাশি কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নিলে ডোমিনেজ স্টিলের ব্যবসায়িক কৌশল, উৎপাদন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং মুনাফা—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে মালিকানা পরিবর্তন নিজে থেকেই কোম্পানির আর্থিক সংকটের সমাধান নয়। নতুন মালিকরা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবসা পুনর্গঠন করতে পারেন, উৎপাদন ও রাজস্ব বাড়াতে পারেন এবং লোকসান কমিয়ে কোম্পানিকে ধারাবাহিক মুনাফায় ফেরাতে পারেন—সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফলে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন শুধু শেয়ার হস্তান্তরের দিকে নয়; বরং নতুন মালিকানায় ডোমিনেজ স্টিলের ব্যবসা ও আর্থিক ফলাফলে বাস্তব পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকেও।