বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট গড়ে তোলার অনুসন্ধানের মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রিত জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন—বিএসইসি। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট—বিএফআইইউর অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিএসইসির নির্দেশনায় আদনান ইমামের সংশ্লিষ্ট দুটি বিও হিসাবের ডেবিট লেনদেন স্থগিত করেছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড—সিডিবিএল। ফলে এসব হিসাব থেকে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি কিংবা অন্য কোনো বিও হিসাবে স্থানান্তর করা যাবে না।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম জানান, আদনান ইমামের বিষয়ে বিএফআইইউর পাঠানো অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা করেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন। এর অংশ হিসেবেই তার বিও হিসাব থেকে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই বিএসইসির কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠায় বিএফআইইউ। পরে ৪ আগস্ট বিএফআইইউর অনুরোধের ভিত্তিতে সিডিবিএলকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয় বিএসইসি। এরপরই আদনান ইমামের সংশ্লিষ্ট বিও হিসাবগুলোর ডেবিট লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ডিএসএফএম সিকিউরিটিজের বিও-১২০২৯৮০০৩৭১০৩৫৫১ এবং সিটি ব্রোকারেজের বিও-১২০৪৫০০০৩৭১০৩৫৫১ নম্বরের সক্রিয় লিংক বিও হিসাবে আদনান ইমামের জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার রয়েছে। এ দুটি হিসাবেই লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজেও আদনান ইমামের বিও হিসাব রয়েছে। তার চারটি বিও আইডির মধ্যে একটি আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সক্রিয় হিসাবগুলোর মধ্যে যেসব হিসাবে জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার রয়েছে, সেগুলোর ডেবিট লেনদেন বন্ধ রাখা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ১৬ সম্পদের সন্ধান
বিএফআইইউর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে আদনান ইমামের নামে ১৬টি বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে জেনেক্স ইনফোসিসের ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক—ইউসিবি থেকে নেওয়া ৩১৫ কোটি ২০ লাখ টাকার ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণসুবিধার অর্থের একটি অংশ ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, পারস্পরিক যোগসাজশে বিদেশে অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে জেনেক্স ইনফোসিসের অনুকূলে ইউসিবি থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ, ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা, জামানতের পর্যাপ্ততা এবং ঋণের অর্থের ব্যবহার যথাযথভাবে তদারকি করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএফআইইউর অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, ঋণের অর্থ ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর, পুরোনো ঋণ সমন্বয় এবং পুনঃতফসিলের ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের সন্দেহ
২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জেনেক্স ইনফোসিসের লেনদেন পর্যালোচনা করে বিএফআইইউ এসব তথ্য পায়। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ইস্যু করা অধিকাংশ এলসি পরবর্তী সময়ে ফোর্স লোন, টার্ম লোন ও টাইম লোনে রূপান্তর করে সমন্বয় দেখানো হয়েছে।
তবে আমদানি করা পণ্য ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়নি এবং পণ্য বিক্রির অর্থও ব্যাংক হিসাবে ফেরত আসেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বিএফআইইউ।
এ ছাড়া ওয়ার্ক অর্ডার ফাইন্যান্সের আওতায় জেনেক্স ইনফোসিসকে দেওয়া প্রায় ২৯ কোটি টাকার কার্যাদেশ সম্পন্ন হওয়ার পরও অর্থ ব্যাংকে ফেরত না আসাকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী ও মন্দমানের খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আদনান ইমাম পলাতক রয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিএফআইইউর অনুসন্ধান, বিদেশে সম্পদের তথ্য এবং ঋণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রিত জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তরে বিএসইসির নিষেধাজ্ঞা বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
























