দেশের আর্থিক খাত সংস্কারে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়ায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়।
কোন প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের পথে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবসায়ন বা বন্ধের তালিকায় রয়েছে—
• এফএএস ফাইন্যান্স
• ফারইস্ট ফাইন্যান্স
• আভিভা ফাইন্যান্স
• পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
• ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ, দায়-দেনা ও আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে আমানত ফেরতের কার্যক্রম শুরু হবে।
আরও চার প্রতিষ্ঠানকে সময়
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্সকে পুনরুদ্ধারের জন্য আরও তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে তারা ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধে সক্ষমতা দেখাতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও রেজল্যুশন বা অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
২৭ হাজার আমানতকারী কী পাবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধের তালিকায় থাকা পাঁচ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আর্থিক খাতের নিরাপত্তা জোরদার এবং ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষার স্বার্থে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা কতটা নাজুক, তা খেলাপি ঋণের হারেই স্পষ্ট।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে—
• এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৯৯.৯৯ শতাংশ
• ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯.৪৪ শতাংশ
• ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮.৫০ শতাংশ
• পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ
• আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩.৯৩ শতাংশ
অর্থাৎ, প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই আদায় অযোগ্য অবস্থায় পৌঁছে গেছে।
কেন এ অবস্থায় পৌঁছালো?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের পর বছর অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি ধসে পড়ে।
বিশেষ করে বহুল আলোচিত পি কে হালদার কেলেঙ্কারির কারণে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, যা এসব প্রতিষ্ঠানের সংকটকে আরও গভীর করেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ‘জীবিত কিন্তু অকার্যকর’ অবস্থায় থাকা দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ উদ্যোগের ফলে—
আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার পথ তৈরি হবে
আর্থিক খাতে জবাবদিহি বাড়বে
দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমবে
ভবিষ্যতে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক বার্তা যাবে
সব মিলিয়ে, আর্থিক খাত সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
























