ঢাকা   বুধবার ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

চ্যাটজিপিটি-জেমিনাইয়ের বিকল্প বাংলা এআই তৈরি করতে চায় সরকার, আলোচনা চার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১২:২৭, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চ্যাটজিপিটি-জেমিনাইয়ের বিকল্প বাংলা এআই তৈরি করতে চায় সরকার, আলোচনা চার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে

চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির নিজস্ব বাংলা সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য দেশে শক্তিশালী কম্পিউটার, সার্ভার ও তথ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। লক্ষ্য, দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নাগরিকদের ডেটা দেশের ভেতরে রেখেই এআই প্রযুক্তি তৈরি ও পরিচালনা করা। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিশ্বের শীর্ষ চার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাদের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত জাতীয় ডেটা সেন্টারকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে দেশের মূল এআই অবকাঠামো। পাশাপাশি দেশের আট বিভাগে স্থাপন করা হবে আটটি আঞ্চলিক এআই কম্পিউটিং কেন্দ্র। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলোও এসব অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

জাতীয় ডেটা সেন্টারটি বর্তমানে বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) পরিচালনা করছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুরে এআই অবকাঠামো স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে।

কালিয়াকৈরের মূল কেন্দ্রের বাইরে আট বিভাগে আটটি আঞ্চলিক এআই কম্পিউটিং নোড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও স্থানীয়ভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গবেষণার সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘সার্বভৌম এআইয়ের মূল কথা হলো, দেশের নাগরিকদের তথ্য, ডেটা ও নাগরিক সেবার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সুফল যেন সমাজের নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে রিকশাচালকের সন্তান পর্যন্ত সবাই পায়, সেটি নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, দেশে বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করে গবেষণা ও উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করা হবে। জাতীয় অবকাঠামো গড়ে উঠলে এর কম্পিউটিং সক্ষমতা বেসরকারি খাত ও স্টার্টআপগুলোর জন্যও উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

বাংলা ভাষায় নিজস্ব এআই মডেল তৈরির পরিকল্পনা

সরকারের পরিকল্পনায় জেমা, লামা ও কুয়েনের মতো বিদ্যমান এআই মডেলকে বাংলা ভাষার উপযোগী করে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য বিপুল পরিমাণ বাংলা লেখা ও তথ্য ব্যবহার করে এসব মডেলকে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রযুক্তির ভাষায় এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ফাইন টিউনিং।

এর মাধ্যমে বাংলা ভাষায় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, কথাকে লেখায় রূপান্তর, অনুবাদ, শিক্ষা সহায়তা এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবায় এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। মডেল প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোয় পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্যোগের প্রথম ১২ মাসে এআই কম্পিউটার সংযোজনের প্রস্তুতি, জনবলের প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছোট পরিসরে এআই ব্যবস্থা স্থাপন এবং কালিয়াকৈরের অবকাঠামোর কারিগরি সমীক্ষা করা হবে।

পরবর্তী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে বিভাগীয় কেন্দ্রগুলো চালু এবং প্রথম এআই মডেল প্রশিক্ষণের লক্ষ্য রয়েছে। এরপর ২৪ থেকে ৩৬ মাস বা তার বেশি সময়ের মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলোর জন্য এ সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

চ্যাটজিপিটি-জেমিনাই থাকতে নিজস্ব এআই কেন?

চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের মতো এআই সেবা ইতিমধ্যে গবেষণা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পেশাগত বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তথ্য অনুসন্ধান, প্রতিবেদন তৈরি, গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ, একাধিক নথির তুলনা কিংবা সফটওয়্যার তৈরির মতো কাজেও এসব প্রযুক্তি সহায়তা করছে। এর অনেক সুবিধা বিনা খরচেও ব্যবহার করা যায়।

তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এসব এআই সেবা থাকতে বাংলাদেশকে আলাদা করে কেন বিপুল অর্থ ব্যয়ে নিজস্ব এআই অবকাঠামো তৈরি করতে হবে?

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য শুধু সফটওয়্যার থাকলেই হয় না। প্রয়োজন উচ্চক্ষমতার প্রসেসর, শক্তিশালী কম্পিউটার, সার্ভার এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা। একটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া কিংবা একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যও বড় ধরনের কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন।

সরকারের লক্ষ্য হলো, এ ধরনের সক্ষমতা দেশের ভেতরেই তৈরি করা। এতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও নাগরিক তথ্য দেশের বাইরে পাঠানোর প্রয়োজন কমবে এবং নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দেশে সার্ভার স্থাপন করলেই সার্বভৌম এআই নিশ্চিত হবে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে মডেলের মান, তথ্যের প্রাপ্যতা, প্রশিক্ষণের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর। পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং তথ্য ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

টেশিসের কারখানায় সংযোজন হবে এআই যন্ত্রপাতি

সরকারের এ উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হলো, সব ধরনের প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে তৈরি অবস্থায় আমদানি না করে দেশে কিছু যন্ত্রপাতি সংযোজনের সক্ষমতা গড়ে তোলা। এ জন্য গাজীপুরের টঙ্গীতে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) বিদ্যমান কারখানা ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে ছোট আকারের এআই কম্পিউটার সংযোজন করা হবে। পরে উচ্চক্ষমতার ওয়ার্কস্টেশন, সার্ভার এবং সম্পূর্ণ সার্ভার র‍্যাক সংযোজনের সক্ষমতা তৈরি করা হবে।

তবে সব যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে উচ্চক্ষমতার প্রসেসর, মেমোরি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উপাদান বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ তৈরি যন্ত্রপাতি আমদানি করে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় কারখানাকে প্রস্তুত করা হবে। পরবর্তী সময়ে বিদেশ থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন ও পরীক্ষা করা হবে। আরও পরের ধাপে সার্ভারের বিভিন্ন অংশ সংযোজন, যন্ত্রপাতির মান যাচাই এবং মেরামতের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

আগের উদ্যোগের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন

বিদেশি প্রযুক্তিসেবার বিকল্প তৈরির উদ্যোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এ ধরনের বেশ কয়েকটি প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

২০২১ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে ‘যোগাযোগ’ তৈরির কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে জুমের বিকল্প ‘বৈঠক’ এবং হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্প ‘আলাপন’ চালুর পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন।

এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উদ্বোধন করা হয় এআইভিত্তিক ‘জি-ব্রেইন’ প্ল্যাটফর্ম। তখন এটি জাতীয় ডেটা সেন্টারে স্থানান্তর এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।

তবে এসব উদ্যোগের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এবং উদ্বোধনের পর সেবাগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন এআই প্রকল্পের ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা শুরু থেকেই নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, বিদেশি প্রযুক্তিসেবার বিকল্প তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো যেন ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন মেটাতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তিসেবা ছেড়ে ব্যবহারকারীরা কোন বাড়তি সুবিধার কারণে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, সেটিও পরিষ্কার থাকতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি বা উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেবার মান, নিরাপত্তা, ব্যবহারকারীর আগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব উদ্যোগ একসময় ব্যবহারকারীর অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলা ভাষায় নিজস্ব এআই মডেল তৈরি এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে শুধু বড় সার্ভার স্থাপন বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পাওয়ার ওপর নয়; বরং মানসম্মত বাংলা তথ্যভান্ডার, দক্ষ জনবল, তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যবহারকারীর আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর।

সর্বশেষ