ঢাকা   শুক্রবার ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

অবিলম্বে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ সমাবেশ

জাতীয়

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:২১, ৯ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

অবিলম্বে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ সমাবেশ

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা কেবল শ্রমিকদের দারিদ্র্য ও সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় উল্লেখ করে অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন এবং ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।

আজ শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (GBGWF) ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার (NWUC)-এর যৌথ উদ্যোগে এক বিশাল শ্রমিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টারের সভাপতি মোসাঃ সুলতানা বেগমের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচি শেষে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি হাইকোর্ট মোড়, তোপখানা রোড ও পল্টন মোড় প্রদক্ষিণ করে পুনরায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এসে শেষ হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শ্রমিক নেতারা বর্তমান জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয়ের তীব্র সংকট তুলে ধরেন। সভাপতির বক্তব্যে সুলতানা বেগম উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালের ৯ম জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, অথচ পোশাক খাতের শ্রমিকরা চরম বৈষম্যের শিকার। ২০২৩ সালে নির্ধারিত ১২,৫০০ টাকার বর্তমান ন্যূনতম মজুরি খাদ্য, ঘরভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্রমাগত ব্যয়বৃদ্ধির ধাক্কায় ইতোমধ্যে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। বক্তারা মনে করিয়ে দেন যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা তিন বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ভাবলেও এই প্রক্রিয়াটি যেন আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, নামমাত্র পরামর্শ কিংবা মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় পরিণত না হয়।

বক্তারা আরও সতর্ক করে দেন যে, সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে কোনো শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ালে শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন প্রচারণা সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত। বরং ন্যায্য মজুরি শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করে, কর্মস্থলে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাক খাত থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করছে উল্লেখ করে নেতারা বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দায় কেবল সরকারের নয়; আন্তর্জাতিক ক্রেতা-ব্র্যান্ড এবং মালিকপক্ষকেও সমানভাবে নিতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তাদের মৌলিক অধিকার।

সমাবেশে আরও উঠে আসে যে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার মূল কারণ শ্রমিকের সস্তা মূল্য নয়, বরং লাখ লাখ শ্রমিক—যাদের অধিকাংশই নারী—অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশাল অর্থনৈতিক মূল্য উৎপাদন করেন। শ্রমিক কেবল উৎপাদনের কোনো "খরচ" নয়, তারাই সকল মূল্যের সৃষ্টিকর্তা। দশকের পর দশক ধরে কাজের অতিরিক্ত চাপ, কম মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বোঝা শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র তাপদাহ ও 'হিট স্ট্রেস'-এর মতো নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি যুক্ত হয়েছে, যেখানে চরম উত্তাপের মধ্যেও একই গতিতে উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এই পরিস্থিতি নিরসনে সমাবেশ থেকে ৮ দফা দাবি পেশ করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা নির্ধারণ, মোট মজুরির অন্তত ৬৫ শতাংশ মূল মজুরি (Basic) হিসেবে নিশ্চিত করা এবং বছরে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি (Increment) করা। একই সাথে মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত ও স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের আর্থিক দায়ভার গ্রহণ করা, হিট স্ট্রেসকে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শ্রম অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়নের পূর্ণ অধিকার ও স্থায়ী ত্রিপক্ষীয় সংলাপ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইলিয়াস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নারী কমিটির সভাপতি রোজিনা আক্তার সুমি, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ফরিদ উদ্দীন, দপ্তর সম্পাদক ও নারী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমরিন হোসাইন এ্যানি, সহ-সভাপতি সেলিনা হোসাইন, প্রচার সম্পাদক মোঃ তাহেরুল ইসলাম এবং কার্যকরি সদস্য অঞ্জলি। এছাড়া আঞ্চলিক ও কারখানা পর্যায়ে বক্তব্য দেন গাজীপুর কমিটির নারী বিষয়ক সম্পাদক মৌসুমী সরকার, আহমেদ ফ্যাশন শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ রুবেল, জাকিয়া সুলতানা, জোসনা বেগম, সালমা আক্তার, যমুনা ফ্যাশন ওয়্যার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফারুক হোসেন, প্রান্ত মিয়া, রাসেলসহ মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকবৃন্দ। সমাবেশটিতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সংহতি বক্তব্য রাখেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসাইন।

সর্বশেষ