জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বড় অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ২০২৫ সালে দেশে সম্ভাব্য ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আয় হারিয়েছে। অন্যদিকে, তীব্র গরমে বছরে নষ্ট হচ্ছে ২৬ বিলিয়ন ঘণ্টার বেশি কর্মঘণ্টা। শুধু তাই নয়, মানবসৃষ্ট অতিক্ষুদ্র বস্তুকণাজনিত বায়ুদূষণে ২০২৩ সালে দেশে আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের এমন উদ্বেগজনক চিত্র।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটির বাংলাদেশের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের সহায়তায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
তাপপ্রবাহে বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২৬ বিলিয়ন ঘণ্টার বেশি সম্ভাব্য শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এ হার ৭১ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে সম্ভাব্য আয়হানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তীব্র গরমের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং শ্রমঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় অর্থনীতিতে এ ক্ষতি তৈরি হয়েছে।
শিশু ও প্রবীণদের ঝুঁকি দ্বিগুণের বেশি
তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও প্রবীণদের ওপর। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা বছরে গড়ে ৭ দশমিক ৬ দিন এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণরা ৭ দশমিক ২ দিন তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছেন।
১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের গড়ের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহের সংস্পর্শ বেড়েছে ১৬২ শতাংশ এবং প্রবীণদের ক্ষেত্রে ১৩৬ শতাংশ।
বায়ুদূষণে বছরে প্রাণহানি ২ লাখ ৩৯ হাজার
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মানবসৃষ্ট অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ২.৫ দূষণজনিত মৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৩ সালে এ ধরনের বায়ুদূষণে আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি।
একই বছরে গৃহস্থালি বায়ুদূষণের কারণে আলাদাভাবে ৭৭ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৭৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৬ দশমিক ৪ শতাংশের সমান।
জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি স্বাস্থ্য বাজেটের অর্ধেকের বেশি
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জ্বালানি ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণের তীব্রতা ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে নিট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এ অর্থ জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের ৫২ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।
স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফন্ডাজিওন সিএমসিসির পরিবেশ অর্থনীতিবিদ সৌর দাশগুপ্ত। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শ্রমঘণ্টা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
সিথ্রিইআরের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু নীতিমালায় কৃষি ও পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে।
সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে শ্রমজীবী মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তীব্র গরমেও জীবিকার প্রয়োজনে অনেক মানুষকে বাইরে কাজ করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও বাহকবাহিত রোগের ঝুঁকিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, জিএসসিসির গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ লিড তাহরিম আরিবা চৌধুরী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্য ব্যয় এবং পরিবারের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়গুলো কপ-৩১ সম্মেলনের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি টেকসই জ্বালানিতে রূপান্তরের গতি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
























