ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

অবৈধ অর্থ ও অর্থপাচার ঠেকাতে শেয়ারবাজারে প্রভাবশালীদের হিসাব নজরদারিতে

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:২৪, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অবৈধ অর্থ ও অর্থপাচার ঠেকাতে শেয়ারবাজারে প্রভাবশালীদের হিসাব নজরদারিতে

শেয়ারবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবেশ ও অর্থপাচার ঠেকাতে কঠোর মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় পুঁজিবাজারে লেনদেনকারী রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাব বিশেষ নজরদারির মধ্যে থাকবে। একই সঙ্গে বেনামে লেনদেন বন্ধ এবং সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করতে ব্রোকারেজ হাউজ, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে কঠোর পরিপালন ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ‘সার্কুলার নং-৩১’ জারি করেছে বিএফআইইউ। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে জারি করা নির্দেশনাটি পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সার্কুলারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা তৈরি করার পাশাপাশি তা পরিচালনা পর্ষদ অথবা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট (সিসিইউ) গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি শাখায় শাখা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (বিএএমএলকো) নিয়োগ দিতে হবে।

নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলার ক্ষেত্রে পরিচয় নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট অথবা জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বাড়াতে ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

কোনো কোম্পানির ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের মূল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকে প্রকৃত সুবিধাভোগী বা ‘বেনিফিশিয়ারি ওনার’ হিসেবে শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি (পিইপি), দেশীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি (আইপি), আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ কিংবা অফশোর কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রেও ‘অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ বা ইডিডি প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি কোনো গ্রাহকের সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অথবা বাংলাদেশ সরকারের তালিকাভুক্ত নিষিদ্ধ কিংবা সন্ত্রাসী সত্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে।

লেনদেন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছে বিএফআইইউ। কোনো লেনদেন অস্বাভাবিক, জটিল কিংবা গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ মনে হলে শাখার পরিপালন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিতভাবে জানাতে হবে।

এরপর কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট অভিযোগ বা সন্দেহজনক লেনদেনটি পর্যালোচনা করবে। প্রাথমিক যাচাইয়ে সন্দেহের সত্যতা পাওয়া গেলে ‘গো-এএমএল’ ওয়েবসাইট ব্যবহার করে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট বা এসটিআর জমা দিতে হবে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য প্রতি ছয় মাসে স্ব-মূল্যায়ন করতে হবে। জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর—এই দুই সময়সীমা ধরে নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুযায়ী মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। এর সারসংক্ষেপ পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে বিএফআইইউতে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

শুধু স্ব-মূল্যায়নের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগকে স্বাধীনভাবে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমগুলো যাচাই করতে হবে।

কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সময় তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও পটভূমি যাচাই নিশ্চিত করার নির্দেশও রয়েছে সার্কুলারে। পাশাপাশি কর্মীদের নিয়মিত রিফ্রেশার ট্রেনিং ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কোনো গ্রাহকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে বা তার হিসাব বন্ধ হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের তথ্য, লেনদেনের বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় দলিলপত্র কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।

বিএফআইইউর এই নির্দেশনার ফলে শেয়ারবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ও অর্থপাচারের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গ্রাহকের প্রকৃত পরিচয় ও সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হিসাবের বাড়তি নজরদারি এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং জোরদার হলে পুঁজিবাজারে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।