দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবসা ও পরিচালনা কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সালমান এফ রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ।
বেক্সিমকোর যে তিনটি কোম্পানির পর্ষদে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো—বেক্সিমকো (বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি) লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসি। বর্তমানে তিন প্রতিষ্ঠানেই ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন সালমান এফ রহমান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিষয়ক বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগ বা কাউকে বাদ দেওয়ার জন্য বিএসইসির পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের পরিবর্তন আনতে কোম্পানিকে সাধারণ সভা আহ্বান করে সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
তবে কোম্পানি তিনটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় নতুন পর্ষদ গঠনের পর বিষয়টি বিএসইসিকে জানাতে হবে। পাশাপাশি পরিচালক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও কমিশনকে অবহিত করতে হবে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদে মোট পরিচালকের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ বা ন্যূনতম দুইজন স্বতন্ত্র পরিচালক রয়েছেন কি না, সেটিও কমিশনের যাচাইয়ের আওতায় পড়ে।
তবে পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই বেক্সিমকো কেন বিএসইসিকে চিঠি দিয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বেক্সিমকো গ্রুপ তিন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। তবে পরিচালক নিয়োগ বা অপসারণের এখতিয়ার কমিশনের নেই। কোম্পানি আইন অনুসরণ করেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিচালক নিয়োগের পর কোম্পানিকে বিএসইসিকে বিষয়টি জানাতে হবে। এরপর আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই করে কমিশন অনাপত্তি দেবে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস দেশের পুঁজিবাজারের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট বা এআইএমে গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিট (জিডিআর) হিসেবে তালিকাভুক্ত।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পর্ষদে নয়জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছিল বিএসইসি। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয় কোম্পানিটি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল অনুমোদন ও প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল না। এতে গত বছরের জুনে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের তালিকাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে বিএসইসি কোম্পানিটিকে পর্ষদ সভা আয়োজন এবং বকেয়া হিসাব অনুমোদনের সুযোগ দিলে সেই জটিলতা কাটে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এরই মধ্যে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম আয়োজনের জন্য এখনো আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।
সালমান এফ রহমান ও তার ভাই সোহেল এফ রহমানের উদ্যোগে সত্তরের দশকে বেক্সিমকো গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিকে রপ্তানি-আমদানি ব্যবসা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে বস্ত্র, ওষুধ, সিরামিক, আর্থিক সেবা এবং অন্যান্য খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে গ্রুপটি।
দীর্ঘদিন ধরে বেক্সিমকোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন সালমান এফ রহমান। তার ভাই সোহেল এফ রহমান গ্রুপটির চেয়ারম্যান।
২০২৪ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় সালমান এফ রহমানকে আসামি করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা একটি মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে জনতা ব্যাংক থেকে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড বা ইডিএফ সুবিধার আওতায় বেক্সিমকোর বিভিন্ন কাগুজে কোম্পানির নামে প্রায় ২৮ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে সালমান এফ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর আগে একই ব্যাংক থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরও পাঁচটি মামলা করে সংস্থাটি।
‘ভুয়া’ রপ্তানি বিল ও এলসি ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সালমান এফ রহমান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৭টি মামলা করেছে।
শেয়ারবাজারে কারসাজি, বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিএসইসি সালমান এফ রহমানকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আজীবনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে বেক্সিমকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সোয়া চারশ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তাদের ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের আর্থিক সংকট সামনে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিগুলোর পরিচালনা, ব্যাংকঋণ, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন এবং ব্যবসা পুনর্গঠন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় গ্রুপটির তিন তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সালমান এফ রহমানের সরে দাঁড়ানোর উদ্যোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।





















