ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

জ্বালানি সংকটে বিনিয়োগ স্থবির, টানা পাঁচ মাস ৫ শতাংশের নিচে ঋণ প্রবৃদ্ধি

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:৪৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি সংকটে বিনিয়োগ স্থবির, টানা পাঁচ মাস ৫ শতাংশের নিচে ঋণ প্রবৃদ্ধি

নির্বাচনের পর ব্যবসা ও বিনিয়োগে গতি ফেরার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বেসরকারি খাতের ব্যাংক ঋণে। জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের চাপ থাকায় ঋণ বিতরণেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকগুলো। ফলে টানা পাঁচ মাস ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। আগের মাস জুনে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। জুলাইয়ে সামান্য উন্নতি হলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনো ৫ শতাংশের নিচেই রয়েছে।

চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। ফলে জুলাইয়ের ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এর আগে মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। মার্চের ৪ দশমিক ৭২ শতাংশই তখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ছিল। পরে জুনে প্রবৃদ্ধি আরও নেমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়ায়, যা নতুন সর্বনিম্ন রেকর্ড তৈরি করে। জুলাইয়ে সামান্য বাড়লেও টানা পঞ্চম মাসে তা ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচনের পর দেশে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগের কার্যক্রম বাড়বে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদাও শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ বাড়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। তবে সামনের মাসগুলোতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা করেন তিনি।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে। এ সময়ে অধিকাংশ ব্যবসায়ী নতুন করে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিবর্তে উৎপাদন কমিয়েছেন। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালু রেখেছে, তাদের একটি অংশ উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। এতে সামগ্রিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ার জন্য আগে ঋণের চাহিদা তৈরি হতে হবে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের নতুন ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা নেই। এর অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও তেলের তীব্র সংকটের মধ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—উভয় দিকের সংকটই কাজ করছে।

ঋণ সরবরাহের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো ৩২ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। এ কারণে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করছে।

অন্যদিকে ঋণের চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্যাস সংকট, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন কিংবা পরিকল্পনা বাতিল করছেন।

ব্যাংকাররা আরও জানান, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার কিছু এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধির পেছনে একই সঙ্গে চাহিদা ও সরবরাহ—দুই ধরনের বাধা রয়েছে। একদিকে নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগে অনাগ্রহের কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের চাপ ব্যাংকগুলোকে ঋণ বিতরণে আরও সতর্ক করেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের পরিবেশকেও আরও কঠিন করে তুলেছে।