আইপিও তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম, ড্রেজার কেনা ও নির্মাণ ব্যয়ে অসঙ্গতি, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং কারখানার উৎপাদন বন্ধের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমসের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এসব অনিয়ম ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পাঁচ পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবকে সম্মিলিতভাবে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
২০২০ সালে পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ডমিনেজ স্টিল ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোম্পানিটি ওই অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি। পরে তহবিল ব্যবহারের সময় বাড়ানোর জন্য কমিশনের কাছে আবেদন করা হলে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু বর্ধিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও আইপিওর অর্থের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়।
পরবর্তী সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএমে শেয়ারহোল্ডারদের ভোটের মাধ্যমে আইপিও তহবিল ব্যবহারের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনে কোম্পানিটি। তবে এজিএমে ভোট দেওয়ার জন্য শেয়ারহোল্ডারদের যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছিল, সেখানেও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার ঘটনা তদন্তে উঠে আসে।
কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার তথ্য গোপনের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় ডমিনেজ স্টিলের কারখানা পরিদর্শন করে তদন্ত কমিটি উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ দেখতে পায়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে নরসিংদীর পলাশ কারখানায় সরেজমিন পরিদর্শনেও সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্ত কমিটির মতে, কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মূল্য সংবেদনশীল তথ্য। এই তথ্য প্রকাশ না করে কোম্পানিটি বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে।
তদন্তে আইপিও তহবিলের ব্যবহার, বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্য এবং সিকিউরিটিজ আইন পরিপালনের ক্ষেত্রে একাধিক অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর বিএসইসি মনে করেছে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব কারণে ডমিনেজ স্টিলের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শামসুল ইসলামকে ১ কোটি টাকা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে ১ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পরিচালক সুজিত সাহা, রকিবুল ইসলাম ও আবুল কালাম ভূঁইয়াকেও প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমানকে ৫ লাখ টাকা এবং কোম্পানি সচিব মো. জামির হোসেন চৌধুরীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে কমিশন। নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানান, ডমিনেজ স্টিলের আইপিও তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। তার ভাষ্য, এসব অনিয়মের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন।
তদন্তে আরও জানা যায়, অ্যারেনা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের কাছ থেকে ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় একটি ড্রেজার কিনেছিল ডমিনেজ স্টিল। তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে এজিএমে অনুমোদন নেওয়ার আগেই ড্রেজারটি কেনা হয়েছিল।
ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক এবং এর ব্যয় নিয়েও কোম্পানির দেওয়া তথ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ভ্যাট চালানে ‘ডমিনেজ ৩’ নামের ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক হিসেবে ‘মেসার্স সুন্দরবন শিপবিল্ডার্স’-এর নাম উল্লেখ করা হয়। সেখানে ড্রেজারটির উৎপাদন ব্যয় দেখানো হয়েছিল ২১ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ভ্যাট ছিল ১ কোটি ৭ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ডমিনেজ স্টিলের হিসাবে অ্যারেনা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংকে ড্রেজারটির জন্য ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা পরিশোধের তথ্য রয়েছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসার্স সুন্দরবন শিপবিল্ডার্স ওই ড্রেজারটি তৈরি করেনি।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২১ সালের অক্টোবরে ড্রেজারটি কেনার পর প্রায় তিন বছর—২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—এটি কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি ড্রেজারটির কোনো সার্ভে সনদও ছিল না। ফলে কোনো কাজ পাওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতাও সেটির ছিল না বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে কোম্পানিটির ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার মূলধন অপচয় হয়েছে বলে মনে করেছে তদন্ত কমিটি।
কোম্পানিটির ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণ ব্যয়েও অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ডমিনেজ স্টিলের দাবি অনুযায়ী, ২১ হাজার ২৩৫ বর্গফুট শেড এবং তিনতলা ভবন সম্প্রসারণে আইপিও তহবিল থেকে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং সুদ থেকে পাওয়া আয় থেকে ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
তবে তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ব্যয়ের মধ্যে ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আত্মসাৎ করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়ার পর শুনানিতে কোম্পানির পক্ষে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা বা সিএফও এবং কোম্পানি সচিব উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। তবে তাদের দেওয়া ব্যাখ্যা কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
তবে বিএসইসির তদন্তের ফলাফল নিয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন ডমিনেজ স্টিলের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, আইপিও তহবিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তকারী দলের সদস্যদের মধ্যে কোনো দক্ষ ব্যক্তি ছিলেন না। কমিশনকে বিষয়টি জানানো হবে এবং তার দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডমিনেজ স্টিলের ৩০ শতাংশ শেয়ার আকিজ রিসোর্সেসের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের অনুমোদন দু-এক দিনের মধ্যে পাওয়া গেলে শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এসব তদন্ত নিয়ে তারা চিন্তিত নন বলেও জানান তিনি।
ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির সর্বশেষ শেয়ারদর ছিল ৬২ টাকা ১০ পয়সা।
কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ।






















