ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে কমছে স্বর্ণের দাম

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:০৭, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে কমছে স্বর্ণের দাম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় থাকার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী ডলারের প্রভাবও মূল্যবান ধাতুটির বাজারে চাপ তৈরি করেছে। কয়েক মাস ধরে নিম্নমুখী থাকলেও বছরের শুরুতে যে হারে স্বর্ণের দাম বেড়েছিল, সেই তুলনায় সাম্প্রতিক পতন এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত।

আন্তর্জাতিক বাজারে গত ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬০২ ডলারে উঠেছিল। ৩১ দশমিক ১ গ্রাম সমান এক ট্রয় আউন্সের দাম সেখান থেকে কমে বর্তমানে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনে এর দাম আরও কমার সুযোগ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় জ্বালানি বাজারে দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সাম্প্রতিক কিছু তথ্যও স্বর্ণের বাজারে প্রভাব ফেলছে। আগস্টে দেশটির ভোক্তা ব্যয় এবং মূল ভোক্তা ব্যয় সূচক চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে আরও দীর্ঘ সময় সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে হতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের বাজার বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক ওয়ালবাউম রয়টার্সকে বলেন, ফেডারেল রিজার্ভের কঠোর নীতি স্বর্ণের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করতে পারে। বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে নমনীয়তার ইঙ্গিত এলে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমতে পারে এবং তাতে স্বর্ণের দাম আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা তেলের বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকেও সতর্ক নজর রাখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে সুদের হার নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাতে পারে। তাই ফেডের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাদের পরবর্তী নীতিসংক্রান্ত বার্তার দিকেও তাকিয়ে রয়েছে স্বর্ণের বাজার।

এদিকে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল খালাস সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে হিসাব শুরু হয়েছে। অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। এতে স্বর্ণের চাহিদায় কিছুটা দুর্বলতা তৈরি হওয়ায় দামও কমেছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত স্বর্ণের একটি অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা উত্তর আমেরিকা থেকে কয়েক টন স্বর্ণ দেশে সরিয়ে নিয়েছে। ব্যাংকটির বক্তব্য, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে গুরুতর কোনো সংকট দেখা দিলে তাদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে সহায়তা করবে।

ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত মোট প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্রে রাখা তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিল।

এসব পদক্ষেপের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন দেশগুলো তাদের স্বর্ণের একটি অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে এবং তারা কি সামনে বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে। এমন অনিশ্চয়তার কারণে ব্যক্তিগত পর্যায়েও স্বর্ণে বিনিয়োগ ও চাহিদা কিছুটা কমেছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ স্থানান্তরকে আসন্ন কোনো বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ায় দেশগুলো নিজেদের রিজার্ভ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হচ্ছে। বাণিজ্যিক ও সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি থাকায় অনেক দেশ স্বর্ণের মজুদের অবস্থান নিজেদের কাছাকাছি রাখাকে নিরাপদ মনে করছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বিবিসিকে বলেন, যুদ্ধ ও বাণিজ্য উত্তেজনা কিছু দেশের এমন সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।

তার মতে, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা সম্ভব—এমন জায়গায় স্বর্ণের মজুদ রাখার প্রয়োজনীয়তাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

কাভাতোনির ভাষ্য, সামনে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় আসছে—এমন আশঙ্কা তিনি করছেন না। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি সচেতন হয়ে উঠছে।