ঢাকা   বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বাড়ায় কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫,০৭৭টি

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:৫২, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বাড়ায় কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৫,০৭৭টি

ব্যাংক খাতে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত বাড়ার প্রভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছরের জুন প্রান্তিকে এ ধরনের হিসাব ৫ হাজার ৭৭টি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংকারদের মতে, এই হিসাবের প্রায় ৭০ শতাংশই প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ায় এর সংখ্যা বৃদ্ধি সরাসরি নতুন কোটিপতি তৈরির চিত্র নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে—এমন ব্যাংক হিসাবগুলোর বিপরীতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। তিন মাস আগে মার্চ শেষে এসব হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকারদের ধারণা, এসব হিসাবের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির। বাকি বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা। ফলে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে দেশের কোটিপতি মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সরাসরি সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত সাধারণত প্রতিবছরই বাড়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, করপোরেট গ্রাহকসহ বিভিন্ন শ্রেণির আমানতকারীর অর্থ ব্যাংকে জমা হওয়ার ফলে মোট আমানতের পরিমাণ বাড়তে থাকে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই প্রবৃদ্ধির গতি কখনো বাড়ে, আবার কখনো কমে। এর প্রভাব পড়ে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যাতেও।

পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন রয়েছে। জুনে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংক খাতে মোট আমানত বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। বিপরীতে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোর আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর আগের বছর এ শ্রেণির আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।

ব্যাংকারদের মতে, দেশের অর্থনীতির আকার এবং ধনিক শ্রেণির তুলনায় ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা এখনো অনেক কম। ফলে ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের পরিমাণ দিয়ে দেশের মোট সম্পদ বা সম্পদের বণ্টনের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। ধনী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার পরিবর্তে জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করে থাকেন।

এ ছাড়া ধনিক শ্রেণির একটি অংশ উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাচার করা অর্থ দিয়ে বিদেশে বাড়ি-গাড়ি কেনা এবং বিলাসী জীবনযাপনের প্রবণতার কথাও বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে।

ব্যাংকাররা মনে করেন, অতিরিক্ত ভ্যাট-কর এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির আশঙ্কাও অনেক ধনী ব্যক্তিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখে। আবার কেউ কেউ ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ রাখলেও তা একাধিক হিসাবে ভাগ করে রাখেন।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংক খাতের সংকটও ধনিক শ্রেণির একটি অংশকে ব্যাংকমুখী হতে নিরুৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন তারা।

মেঘনা ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকে অতিধনীদের জমা অর্থের পরিমাণ খুবই কম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশে ধনী-গরিবের সম্পদের বৈষম্যও প্রকট। কিন্তু ব্যাংক হিসাবের তথ্য সেই বৈষম্যের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটায় না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এত বড় জনসংখ্যার একটি দেশে ব্যক্তিশ্রেণির মাত্র ১২০টি ব্যাংক হিসাবে ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার মতে, এর অর্থ হতে পারে অতিধনীরা ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ রাখছেন না। আবার একই ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ রাখতেও তারা স্বস্তি বোধ করছেন না।

কোটি টাকার আমানতে ওঠানামা

কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ও এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার। ওই সময়ে এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

এর ছয় মাস আগে, ২০২৫ সালের জুন শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার। তখন এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ এক সময়ে হিসাবের সংখ্যা বাড়লেও এসব হিসাবে জমা অর্থ কমতে পারে, আবার অন্য সময়ে হিসাবের পাশাপাশি আমানতের পরিমাণও বাড়তে পারে। ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের প্রবাহ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ রাখার প্রবণতার সঙ্গে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা এবং আমানতের পরিমাণে ওঠানামা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের তথ্য বিশ্লেষণের সময় এসব হিসাবের ধরন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে সরাসরি কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিশ্রেণির কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়লে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখার কারণ নেই।

তবে একজন ব্যক্তির বৈধ আয়, বেতন-ভাতা, ব্যবসা থেকে আয় এবং মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কত সময়ে কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব, সেটিও হিসাব করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। কারও আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে ব্যাংক হিসাবে দ্রুত অর্থ বাড়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বাড়ার আরেকটি দিক হলো সম্পদের বণ্টন। আরও বেশি মানুষের হাতে কোটির ওপর সম্পদ থাকা সম্পদ বণ্টনের অসমতা বাড়ার ইঙ্গিতও দিতে পারে। অল্প কিছু মানুষের হাতে অতিরিক্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাটের বিষয়টি অনেককে নিরুৎসাহিত করে।

তিনি বলেন, কর ফাঁকির উদ্দেশ্যেও কেউ কেউ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকার চেষ্টা করেন। আবার আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় বৈধ অর্থ ব্যাংকে রাখতেও অনেকে ভয় পান।

দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে থাকা ভয় ও অনাস্থার সংস্কৃতি দূর করতে হবে বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন। একই সঙ্গে আইনের অপপ্রয়োগ যাতে মানুষের জন্য হয়রানি বা বিপদের কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।