দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হঠাৎ করেই স্বস্তির চিত্র দেখা দিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের ডলারের দর কমেছে প্রায় ১ টাকা। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক রেমিট্যান্স হাউস থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭০ পয়সা দরে কিনেছে। এক সপ্তাহ আগেও একই ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৬০ থেকে ৭০ পয়সা।
ব্যাংকারদের মতে, বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়াই এই দরপতনের প্রধান কারণ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট ওপেন পজিশন (এনওপি) দীর্ঘমেয়াদি নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি থাকায় তাদের হাতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে। ফলে নতুন করে বেশি দামে রেমিট্যান্সের ডলার কেনার আগ্রহ কমেছে ব্যাংকগুলোর।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা ডলার দ্রুত বাজারে ছাড়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এ কারণে আমদানিকারকদের এলসি নিষ্পত্তিতে তুলনামূলক কম দরের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে এলসি নিষ্পত্তির দরও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বৃহস্পতিবার কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী প্রায় ১২৩ টাকা ১০ পয়সা দরে এলসি নিষ্পত্তি করেছে।
রেমিট্যান্স বাড়ায় সরবরাহে চাপ
ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। চলতি আগস্টের প্রথম ১২ দিনেই দেশে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। একই সময়ে সরকারি এলসি পেমেন্টের চাপ জুলাইয়ের তুলনায় কম থাকায় বাজারে ডলারের চাহিদাও তুলনামূলক কম।
ফলে একদিকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে নতুন ডলার আসছে, অন্যদিকে আমদানি ও সরকারি পরিশোধের চাপ কম থাকায় সেই ডলারের চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিময় হারে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী সপ্তাহে ডলারের দর আরও কমতে পারে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার না কিনলে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ২০ পয়সার কাছাকাছি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান কী?
তবে ডলারের দর অতিরিক্ত কমে যাওয়াকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ১২২ টাকা ২০ পয়সার নিচে দর নেমে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনে বাজারে ভারসাম্য রাখার উদ্যোগ নিতে পারে।
অর্থাৎ বর্তমানে ডলারের বাজারে মূল চ্যালেঞ্জ আর সংকট নয়; বরং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দর কতটা নিচে নামবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এলসি নিষ্পত্তিতেও কমছে ডলার
রেমিট্যান্সের ডলারের দর কমার প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয়ের ওপরও। কয়েকটি ব্যাংকে গত কয়েক দিনে এলসি নিষ্পত্তির দর ধাপে ধাপে কমেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকে মঙ্গলবার সকালে যেখানে ১২৩ টাকা ৭০ পয়সায় এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, বিকেলে তা কমে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় নামে। বুধবার বিকেলে দর আরও কমে ১২৩ টাকা ২৫ পয়সায় এবং বৃহস্পতিবার তা ১২৩ টাকা ১০ পয়সার কাছাকাছি নেমে আসে।
এতে আমদানিকারকদের জন্য পণ্য আমদানির ডলার ব্যয় কিছুটা কমছে। বাজারে ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলে আগামী সপ্তাহে এলসি নিষ্পত্তির খরচ আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
জুলাইয়ের চিত্র ছিল ভিন্ন
এর আগে জুলাইয়ে সরকারি পেমেন্টের চাপ বেশি থাকায় ডলারের চাহিদা বেড়েছিল। ফলে সে সময় ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে ডলার সংগ্রহ করেছিল।
জুন ও জুলাই—টানা দুই মাসে রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে থাকলেও তার আগের ছয় মাসে ধারাবাহিকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্ত অবস্থানও বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করছে।
রিজার্ভেও ইতিবাচক চিত্র
ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও উন্নতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী ১৩ আগস্ট দেশের মোট রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাবেও রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে।
সব মিলিয়ে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং সরকারি পেমেন্টের চাপ কমে যাওয়ায় আপাতত ডলারের বাজারে চাহিদার চেয়ে সরবরাহই বেশি। ফলে স্বল্পমেয়াদে ডলারের দর আরও কমার চাপ থাকতে পারে।
তবে দর অতিরিক্ত কমে গেলে রেমিট্যান্সে নিরুৎসাহ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার কিনে ভারসাম্য আনার উদ্যোগ নেয় কি না, এখন সেটিই নজর রাখার বিষয়।
























