বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার নিয়ম শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নিয়মে এসব কোম্পানি তাদের মূল কোম্পানি, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারধারীদের কাছ থেকে তুলনামূলক সহজে এবং কম খরচে বৈদেশিক ঋণ নিতে পারবে।
বুধবার এ–সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন এই সুবিধার ফলে বিদেশি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কম খরচে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এতে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহ তৈরি হবে।
কারা এই সুবিধা পাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড), হাইটেক পার্কসহ বিশেষায়িত অঞ্চলে পরিচালিত সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাবে।
এ ছাড়া এসব অঞ্চলের বাইরে উৎপাদন ও সেবা খাতে পরিচালিত সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিও বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সুবিধার আওতায় আসবে।
এক বছরের কম মেয়াদি ঋণে সুবিধা
নতুন নিয়মে এক বছরের কম মেয়াদি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত অঞ্চলের বাইরে থাকা সম্পূর্ণ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদন নিতে হবে না।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো বিদেশি কোম্পানির বাংলাদেশি কারখানায় কাঁচামাল কেনা বা দৈনন্দিন ব্যবসার খরচ মেটাতে ১০ লাখ ডলারের স্বল্পমেয়াদি অর্থের প্রয়োজন হলো। প্রতিষ্ঠানটি তার বিদেশি মূল কোম্পানি বা শেয়ারধারীর কাছ থেকে সুদমুক্ত ঋণ নিতে পারবে।
তবে সুদযুক্ত ঋণ নিলে এর বার্ষিক সর্বোচ্চ অল-ইন-কস্ট হবে ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণের সুদ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচ মিলিয়ে বছরে ৩ শতাংশের বেশি ব্যয় করা যাবে না।
এ ধরনের ঋণ মেয়াদ শেষে এককালীন পরিশোধ করতে হবে। তবে প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত ঋণের মেয়াদ বাড়ানো বা রোলওভার করা যাবে।
মধ্যমেয়াদি ঋণে বড় অঙ্কের সুবিধা
এক থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি মধ্যমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
মূলধনি ব্যয়—যেমন নতুন যন্ত্রপাতি কেনা, কারখানা নির্মাণ বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য—সর্বোচ্চ ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া এসব কাজে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত সুদযুক্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সহজভাবে বলা যায়, কোনো বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে নতুন কারখানা স্থাপনে ৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চাইলে, নির্দিষ্ট শর্তে তার বিদেশি মূল কোম্পানি থেকে এই অর্থ ঋণ হিসেবে নিতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণেও সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ খরচ
পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঋণে সুদ থাকলে বার্ষিক সর্বোচ্চ অল-ইন-কস্ট ৩ শতাংশ হতে পারবে।
অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানিগুলোকে তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ঋণ ইকুইটিতে রূপান্তরের সুযোগ
নতুন নীতিমালায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রাখা হয়েছে। কোনো বিদেশি কোম্পানির বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সমস্যা হলে নির্দিষ্ট শর্তে সেই বকেয়া ঋণ ইকুইটিতে রূপান্তর করা যাবে।
অর্থাৎ, ঋণদাতা যদি রাজি থাকে, তাহলে বকেয়া ঋণের অর্থ কোম্পানির শেয়ারে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। এতে কোম্পানির ওপর ঋণের চাপ কমতে পারে এবং আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সহজ শর্তে এবং কম খরচে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ থাকলে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, কারখানা স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে আরও আগ্রহী হবে। এতে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।






















