সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলেও বিক্রির চাপ ও লেনদেনের গতি কমে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবস বুধবার (১৫ জুলাই) দেশের শেয়ারবাজারে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। এদিন প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক বেড়েছে ১৫ পয়েন্টের বেশি। তবে লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে এবং আগের কার্যদিবসের তুলনায় টাকার অঙ্কে লেনদেনও কমেছে। এর মধ্যেই ব্লক মার্কেটে পাঁচ কোম্পানির শেয়ারে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে। একই দিনে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে বিএসআরএম স্টিল। অন্যদিকে গ্রামীণফোন ঘোষণা করেছে ১০৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা চার কার্যদিবস সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বাজারের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে দিনের শুরুতে সূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থানের পর বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিনিয়োগকারীদের একাংশ মুনাফা তুলে নিতে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। এতে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং দিনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সূচক কিছুটা নেমে আসে। ফলে সূচক ইতিবাচক থাকলেও লেনদেনের গতি কমে এবং দরপতন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যায়।
বুধবার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৫ দশমিক ০৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৯২৬ দশমিক ২৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস ১ দশমিক ৯০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ২০৮ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ দশমিক ৮০ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ২৪২ দশমিক ৯০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
এদিন ডিএসইতে ৪০০টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১৩১টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে, ২১৮টির কমেছে এবং ৫১টির দর অপরিবর্তিত ছিল। দিন শেষে ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৫১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ফলে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ১৩৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বুধবার ৩২ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সিএসইতে ২৫৬টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১০১টির দর বেড়েছে, ১২৫টির কমেছে এবং ৩০টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এদিন সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৯১ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৮৬৯ দশমিক ৮১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ব্লক মার্কেটে পাঁচ শেয়ারে বড় লেনদেন
বুধবার ডিএসইর ব্লক মার্কেটে মোট ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এদিন ব্লক মার্কেটে মোট ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে।
ব্লক মার্কেটে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারে। কোম্পানিটির ১৭ কোটি ৩৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরপর আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৫ কোটি ৭৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ৩ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৩ কোটি ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের ৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ ব্লক মার্কেটে এই পাঁচ কোম্পানির শেয়ারে মোট ৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে।
লেনদেনের শীর্ষে বিএসআরএম স্টিল
বুধবার ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে বিএসআরএম স্টিল। কোম্পানিটির ৩৭ কোটি ৪১ লাখ ২ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের ৩৬ কোটি ৭৭ লাখ ৩২ হাজার টাকার এবং তৃতীয় স্থানে থাকা মালেক স্পিনিং মিলসের ৩৫ কোটি ৭৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
লেনদেনের শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, এসিআই ফর্মুলেশনস, রবি আজিয়াটা, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম এবং সিটি ব্যাংক।
১০৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ গ্রামীণফোনের
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি গ্রামীণফোন ২০২৬ সালের জন্য ১০৫ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ৩০ জুন ২০২৬ সমাপ্ত ছয় মাসের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের পাশাপাশি এই লভ্যাংশ ঘোষণা করে।
১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হবে। লভ্যাংশ পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১২ আগস্ট।
তবে কোম্পানিটির মুনাফায় কিছুটা পতন দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৫ টাকা ৬২ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬ টাকা ৫১ পয়সা। জানুয়ারি-জুন ছয় মাসে ইপিএস দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৫২ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১ টাকা ২১ পয়সা।
এ ছাড়া ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) কমে ২২ টাকা ২৭ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬ টাকা ৯৪ পয়সা। কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ৩০ জুন ২০২৬ শেষে দাঁড়িয়েছে ৪১ টাকা ৫১ পয়সা।
দরপতনের শীর্ষে জুট স্পিনার্স
বুধবার ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে রয়েছে জুট স্পিনার্স। কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৮ টাকা ৬০ পয়সা বা ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে।
দরপতনের তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ১৪ টাকা ২০ পয়সা বা ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্সের শেয়ারদর কমেছে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
এ ছাড়া সোনারগাঁও টেক্সটাইল, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সাইফ পাওয়ারটেক, অ্যাপেক্স ট্যানারি, এটলাস বাংলাদেশ, দেশ গার্মেন্টস এবং নাহি অ্যালুমিনিয়ামের শেয়ারদরও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
দর বৃদ্ধির শীর্ষে এসিআই ফর্মুলেশনস
অন্যদিকে, বুধবার ডিএসইতে দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে এসিআই ফর্মুলেশনস। কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৫ টাকা ৭০ পয়সা বা ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়েছে।
দর বৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা আরামিট সিমেন্টের শেয়ারদর বেড়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে ৬৭ টাকা ৮০ পয়সা বা ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এ ছাড়া ফার্মা এইডস, এআইবিএল ১ম ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, ইসলামী ফাইন্যান্স, ওরিয়ন ইনফিউশন, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, ডিবিএইচ ১ম মিউচুয়াল ফান্ড এবং বিএসআরএম স্টিলের শেয়ারদরও বেড়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, টানা চার কার্যদিবস সূচকের উত্থান বাজারে ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সূচক ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি চলে আসায় মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ও বিক্রির চাপও বাড়তে পারে। ফলে সামনের দিনে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের ধারাবাহিকতা এবং বাজারে অংশগ্রহণকারী কোম্পানির সংখ্যা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।





















