পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ ব্যবহারে নতুন নিয়ম চালু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটি ও ঋণের অনুপাত, মার্জিন কল এবং শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়মে ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের অন্তত ৫০ শতাংশ রাখতে হবে। আর ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো নোটিশ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট শেয়ার বিক্রি করতে হবে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের স্বাক্ষরে জারি করা আদেশে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা’-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন করা হয়।
ইক্যুইটি কমলেই মার্জিন কল
নতুন বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ থাকতে হবে। কোনো কারণে এই অনুপাত ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট মার্জিন অর্থায়নকারীকে দ্রুত গ্রাহককে মার্জিন কল দিতে হবে।
লিখিত চিঠির পাশাপাশি গ্রাহকের নিবন্ধিত ই-মেইল বা মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠিয়েও এই মার্জিন কল দেওয়া যাবে।
মার্জিন কল পাওয়ার পরও তিন ট্রেডিং দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বা মার্জিন জমা না দিলে ওই হিসাবে নতুন করে মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে গ্রাহকের হিসাবে থাকা সিকিউরিটিজ বিক্রি করে ইক্যুইটি আবার নির্ধারিত ৫০ শতাংশে আনার ব্যবস্থা করা যাবে।
২৫ শতাংশের নিচে নামলেই নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রি
সংশোধিত বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ২৫ শতাংশের সীমা। কোনো গ্রাহকের ইক্যুইটি মার্জিন অর্থায়নের ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিকিউরিটিজ কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করতে হবে।
অর্থাৎ, বাজারে কোনো শেয়ারের দাম দ্রুত কমে গিয়ে বিনিয়োগকারীর মার্জিন হিসাবে ইক্যুইটি নির্ধারিত সীমার নিচে চলে গেলে ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি ওই হিসাবের শেয়ার বিক্রি করতে পারবে।
ঋণের পরিমাণেও থাকছে সীমা
নতুন নিয়মে কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান তার কোর ক্যাপিটাল বা নিট সম্পদের চার গুণের বেশি মার্জিন ঋণ দিতে পারবে না।
একই সঙ্গে কোনো একটি সিকিউরিটিতে প্রতিষ্ঠানটির মোট মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি দেওয়া যাবে না। ফলে একটি নির্দিষ্ট শেয়ারে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ঝুঁকি কমবে।
এ ছাড়া কোনো মার্জিন হিসাবে গ্রাহকের ইক্যুইটির তুলনায় মার্জিন অর্থায়ন বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ, গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ রাখতে হবে।
মার্জিন ঋণের অর্থে অন্য কাজে বিনিয়োগ নয়
মার্জিন অর্থায়নের অর্থ শুধুমাত্র মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজ কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে নির্ধারিত ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের ন্যূনতম অনুপাত ঠিক থাকলে গ্রাহক তার মার্জিন হিসাব থেকে অর্থ তুলতে পারবেন।
মার্জিন ঋণ নেওয়ার সময় গ্রাহকের হিসাবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। এর কম বিনিয়োগ থাকলে ওই হিসাবে মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না।
এ ছাড়া মার্জিনের জন্য অযোগ্য কোনো সিকিউরিটি নগদ অর্থে কেনা হলেও সেটিকে গ্রাহকের ইক্যুইটি হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
বেশি পিই রেশিও ও লোকসানি কোম্পানিতে মার্জিন বন্ধ
নতুন নিয়মে কোনো সিকিউরিটির পিই রেশিও ৪০-এর বেশি হলে ওই শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। একইভাবে কোনো কোম্পানির ইপিএস ঋণাত্মক হলে সেই সিকিউরিটিতেও মার্জিন ঋণ নিষিদ্ধ থাকবে।
তবে তালিকাভুক্ত জীবন বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই রেশিওর পরিবর্তে পিবি রেশিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। পিবি রেশিও ৩-এর বেশি হলে কিংবা কোম্পানির নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হলে ওই শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।
মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি নির্ধারণে সহায়তার জন্য স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে নিয়মিতভাবে পিই রেশিও এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পিবি রেশিও নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
কোন শেয়ারে মার্জিন ঋণ মিলবে না
নতুন বিধান অনুযায়ী স্টক এক্সচেঞ্জের জি, এন ও জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।
এ ছাড়া এসএমই, এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্ম বা বোর্ডে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও মার্জিন অর্থায়নের আওতার বাইরে থাকবে।
আলাদা ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক
গ্রাহকদের মার্জিন অর্থায়নের জন্য প্রতিটি মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজ নামে আলাদা ব্যাংক হিসাব রাখতে হবে। ওই হিসাব শুধুমাত্র মার্জিন অর্থায়নসংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা যাবে।
শাখা অফিস বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে না। আগে থেকেই শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে থাকা হিসাবগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর পর কমিশনের অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা যাবে না।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন কমিটি
প্রতিটি মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে দুই সদস্য নিয়ে একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। বছরে অন্তত চারবার এই কমিটির সভা করতে হবে। সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে উপস্থাপন করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিজস্ব মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা তৈরির সময়ও সংশোধিত বিধিমালায় থাকা কোনো শর্ত বা বিধান শিথিল করা যাবে না।
গবেষণা দলের পারিশ্রমিকেও বিধিনিষেধ
মার্জিন অর্থায়নকারীর গবেষণা দলের সদস্যদের বেতন, ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা সরাসরি ট্রেডিং কমিশন আয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না।
অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন চালু করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড থাকতে হবে। এ ধরনের মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালাও ওই বোর্ড বা শরিয়াহ উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করতে হবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বিধিমালায় মার্জিন ঋণের পরিমাণ, গ্রাহকের ইক্যুইটি, শেয়ার বিক্রি এবং ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর সীমা নির্ধারণের ফলে পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে মার্জিন হিসাবের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় নতুন কাঠামো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
























