ঢাকা   বুধবার ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

সূচকের ৫৭ পয়েন্ট উত্থানেও আস্থা ফেরেনি, বিএসইসির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:০২, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

সূচকের ৫৭ পয়েন্ট উত্থানেও আস্থা ফেরেনি, বিএসইসির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

টানা চার কার্যদিবসে ১৩৩ পয়েন্ট হারানোর পর একদিনে ৫৭ পয়েন্টের বেশি বাড়লেও দেশের শেয়ারবাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূল্যসূচকের উত্থান এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি পেলেও কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। ফলে বাজারের এই ঘুরে দাঁড়ানো কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সাময়িক উত্থানের পর আবারও দরপতন শুরু হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিও দেখছেন তারা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দরপতন ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে বর্তমান কমিশনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টদের একাংশ।

এক দিনের উত্থানে ফিরছে না আস্থা

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, টানা চার দিনের পতনে সূচক ১৩৩ পয়েন্ট কমার পর একদিনে ৫৭ পয়েন্টের কিছু বেশি বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট নয়। অতীতেও একদিন সূচক বাড়ার পর পরবর্তী কয়েক কার্যদিবসে ধারাবাহিক পতনের নজির রয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, বৃহস্পতিবার থেকেই বাজার আবার নিম্নমুখী ধারায় ফিরতে পারে। পতন অব্যাহত থাকলে প্রধান সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটি বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে দরপতন চললেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সফলতা নেই। ফলে কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, বর্তমান কমিশনের দায়িত্ব পালনকালে একপর্যায়ে ডিএসইর প্রধান সূচক প্রায় ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সে সময় লেনদেনও ছিল সন্তোষজনক। বাজারের ইতিবাচক প্রবণতায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল এবং অনেকে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক দরপতনে সেই ইতিবাচক পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সূচক ও শেয়ারদরের ক্রমাগত পতনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আবারও তলানিতে নেমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১০ সালের ধসের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা

বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১০ সালের শেয়ারবাজারের মহাধসের আগের অবস্থার তুলনা করছেন। তাদের ভাষ্য, ওই ধসের আগে বাজারে সূচক ও লেনদেন অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আকৃষ্ট হয়ে বিপুলসংখ্যক নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে প্রবেশ করেন। পরবর্তী ভয়াবহ দরপতনে তাদের অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

তাদের মতে, বর্তমান কমিশনের সময়েও প্রথমদিকে বাজারের ইতিবাচক প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করেছিল। কিন্তু পরবর্তী ধারাবাহিক পতন সেই প্রত্যাশাকে হতাশায় পরিণত করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বিনিয়োগকারীকে ২০১০ সালের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাময়িক স্থিতিশীলতা ও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর বিনিয়োগে আগ্রহী হওয়া অনেক বিনিয়োগকারী পরবর্তী দরপতনে আবারও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাজার সংস্কার ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না।

এ অবস্থায় বর্তমান কমিশনের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশ। তাদের বক্তব্য, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে কমিশনের সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত।

কারসাজি চক্রের সক্রিয়তা নিয়েও উদ্বেগ

বাজারে সক্রিয় কারসাজি চক্রের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, এসব চক্রের প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট তদন্তের ফলাফল কিংবা সংশ্লিষ্ট কারসাজি চক্রের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এগুলো বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ও মূল্যায়ন।

ডিএসইতে তিন সূচকের উত্থান

এদিকে বুধবার সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে ডিএসইতে তিনটি মূল্যসূচকই বেড়েছে। পাশাপাশি লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

দিন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৫৭ দশমিক ৩১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩৪১ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

অন্য দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস ৬ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৩৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে এবং বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৩৭ দশমিক ৬১ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

দাম বেড়েছে ২৮২ প্রতিষ্ঠানের

বুধবার ডিএসইতে মোট ৩৮৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ২৮২টির দাম বেড়েছে, কমেছে ৫১টির এবং ৫০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে। বিপরীতে ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশের দর কমেছে এবং ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশের দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

অর্থাৎ শেয়ারদরের উত্থানের ক্ষেত্রে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও লেনদেন কমে যাওয়ায় এই উত্থানের শক্তি নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সূচক বাড়লেও ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ৪৩ কোটি টাকা

বুধবার ডিএসইতে মোট ৫২২ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা প্রায় ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সূচকের উত্থানের পাশাপাশি লেনদেন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু বুধবার অধিকাংশ শেয়ারের দাম ও সূচক বাড়লেও লেনদেন কমেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সিএসইতে সূচক বাড়লেও লেনদেনে বড় পতন

দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) বুধবার সূচকের উত্থান হয়েছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এদিন সিএসইতে মোট ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ফলে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা বা প্রায় ৬৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

সিএসইতে মোট ১৪৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ৮১টির দাম বেড়েছে, ৪১টির কমেছে এবং ২৫টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।

অন্যদিকে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৩১৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের কার্যদিবসে সূচকটি ১৭৪ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট কমেছিল।

অর্থাৎ আগের দিনের পতনের পর সূচক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও লেনদেনে বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে।

সাময়িক উত্থান নয়, স্থায়ী স্থিতিশীলতা চান বিনিয়োগকারীরা

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, একদিনের সূচক বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটাতে তা যথেষ্ট নয়। ধারাবাহিক পতনের পর সাময়িক উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে আবার দরপতনের প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

তাদের বক্তব্য, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু সূচকের সাময়িক বৃদ্ধি চান না। তারা এমন একটি বাজার প্রত্যাশা করেন, যেখানে স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে শেয়ারদর নির্ধারিত হবে, কারসাজি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে শুধু সংস্কারের ঘোষণা বা আশ্বাস নয়, বাস্তবভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বুধবারের বাজার পরিস্থিতিতে ডিএসই ও সিএসই—উভয় বাজারেই সূচক এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দুই বাজারেই লেনদেন কমেছে। ফলে দিনের ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কার্যদিবসগুলোতে সূচক ও লেনদেনের ধারাবাহিক উন্নতি না হলে বুধবারের উত্থানও সাময়িক হয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সর্বশেষ