শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল পিএলসির ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটির বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অগ্রিমের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি প্রায় ২৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার পাওনার অস্তিত্ব, হিসাবের যথার্থতা ও আদায়যোগ্যতা যাচাই করতেও পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি। এ ছাড়া প্রায় ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের অবচয় হার পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণে ঘাটতি পেয়েছেন নিরীক্ষক।
এসব অসংগতির কারণে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে শর্তযুক্ত মতামত (কোয়ালিফায়েড ওপিনিয়ন) দিয়েছেন নিরীক্ষক। এর মধ্যে বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া অগ্রিম অর্থের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না পাওয়াকে শর্তযুক্ত মতামতের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পাওনা অর্থের হিসাব এবং স্থায়ী সম্পদের অবচয় হার পরিবর্তনের বিষয় দুটি বিশেষ গুরুত্বারোপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ দুটি বিষয় নিরীক্ষকের মতামত পরিবর্তনের কারণ হয়নি।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অগ্রিম, পাওনা ও স্থায়ী সম্পদের হিসাব মিলিয়ে প্রায় ৭৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বিভিন্ন খাতে নিরীক্ষাগত সীমাবদ্ধতা বা হিসাবনীতি প্রয়োগের প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয় কোম্পানির সম্পদের যথার্থতা, পাওনা আদায় এবং আর্থিক ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অগ্রিমের পক্ষে নথিপত্র নেই
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ৬ নম্বর টীকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষকে কাঁচামাল ও জমি কেনার জন্য অগ্রিম দেওয়া হয়েছে ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ৯৪৪ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৩ হাজার ১৯৩ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে অগ্রিম বেড়েছে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৭৫১ টাকা বা প্রায় ২৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অগ্রিমের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের বিস্তারিত পরিচয় এবং লেনদেনের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। ফলে কার কাছে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, এসব লেনদেনের যথার্থতা কী এবং অর্থের বিপরীতে পণ্য বা জমি পাওয়া যাবে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে অগ্রিম হিসেবে দেখানো অর্থের প্রকৃত অস্তিত্ব, হিসাবের নির্ভুলতা এবং ভবিষ্যতে তা আদায় বা সমন্বয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি নিরীক্ষক। এ কারণে বিষয়টি তাঁর শর্তযুক্ত মতামতের অন্যতম ভিত্তি হয়েছে।
তবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে পুরো অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কিংবা তা অনাদায়ী হয়ে গেছে। বরং পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে অগ্রিমের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সম্পদ বা অর্থের যথার্থতা নিশ্চিত করা যায়নি।
অগ্রিম, জামানত ও কর বাবদ ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অগ্রিম, জামানত ও অগ্রিম পরিশোধিত ব্যয়ের মোট পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ৫৮ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯২ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ২৭ লাখ ১৫ হাজার ৮২১ টাকা।
ফলে এক বছরে এ খাতে অর্থ বেড়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ১৭ হাজার ৮৭১ টাকা।
বিস্তারিত হিসাবে দেখা যায়, কর্মীদের দেওয়া অগ্রিমের পরিমাণ ২০২৬ সালে ছিল ১৪ লাখ ৬১ হাজার ২১৪ টাকা। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ২৮ লাখ ১৩ হাজার ২৩৯ টাকা। অর্থাৎ কর্মীদের অগ্রিম কমেছে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ২৫ টাকা।
অন্যদিকে অগ্রিম আয়কর বাবদ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৭২ টাকা। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৭ টাকা। ফলে এ খাতে অর্থ বেড়েছে ৪৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৭৫ টাকা।
মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বাবদ অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ৯১৫ টাকা। আগের বছর ছিল ১ কোটি ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ৪৫৩ টাকা।
এ ছাড়া ঋণপত্রের মার্জিন বাবদ দেখানো হয়েছে ৪৩ লাখ ৪২ হাজার ৪৪৭ টাকা, যা আগের বছরের ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য জামানত বাবদ উভয় বছরেই ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অগ্রিম অর্থগুলো পণ্য দিয়ে সুরক্ষিত নয় এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলো আদায় বা সমন্বয় করা হয়। অন্যদিকে জামানতের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য পরিশোধিত অর্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কোম্পানির আরও দাবি, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা ব্যবস্থাপনা প্রতিনিধিদের কারও কাছে একক বা যৌথভাবে কোনো অর্থ পাওনা নেই। তবে বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া অগ্রিমের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকায় নিরীক্ষকের আপত্তি থেকেই গেছে।
৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের অবচয় হার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন
নাহি অ্যালুমিনিয়ামের আর্থিক প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি পাওয়া গেছে স্থায়ী সম্পদের অবচয় নির্ধারণে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ৩ নম্বর টীকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির সম্পত্তি, কারখানা ও যন্ত্রপাতির নিট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ৮২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৪২ টাকা। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ৩৬ কোটি ১৪ লাখ ২ হাজার ৪৯৪ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরে স্থায়ী সম্পদের নিট মূল্য বেড়েছে ৬৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪৮ টাকা।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০২৩ সালের আয়কর আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট কিছু স্থায়ী সম্পদের অবচয় হার কমিয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল পরিচালনা পর্ষদ এ পরিবর্তনের অনুমোদন দেয়।
তবে আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১৬ অনুযায়ী সম্পদের আনুমানিক ব্যবহারযোগ্য আয়ুষ্কাল যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই অবচয় হার কমানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক।
সাধারণত অবচয় ব্যয় কমলে অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত থাকলে কোম্পানির হিসাবভিত্তিক মুনাফা বেড়ে যেতে পারে। ফলে অবচয় হার পরিবর্তনের যথার্থতা কোম্পানির আর্থিক ফলাফল মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ পরিবর্তনের কারণে কোম্পানির মুনাফা ঠিক কত টাকা বেড়েছে বা কমেছে, সে বিষয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
এক বছরে অবচয় ব্যয় কমেছে ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার টাকা
আর্থিক প্রতিবেদনের বিস্তারিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের হিসাববছরের শুরুতে কোম্পানিটির স্থায়ী সম্পদের মোট ক্রয়মূল্য ছিল ৮৭ কোটি ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৫৩৮ টাকা। আলোচ্য বছরে নতুন সম্পদ সংযোজন হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ ৩২ হাজার ২৯২ টাকার। ফলে বছর শেষে স্থায়ী সম্পদের মোট ক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৯ কোটি ৯৪ লাখ ৯ হাজার ৮৩০ টাকা।
অন্যদিকে আগের অর্থবছরের শুরুতে স্থায়ী সম্পদের ক্রয়মূল্য ছিল ৮৫ কোটি ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার ৩০৩ টাকা। ওই বছর নতুন সম্পদ সংযোজন হয়েছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার ২৩৫ টাকার। ফলে ২০২৫ সালের ৩০ জুন স্থায়ী সম্পদের মোট ক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৮৭ কোটি ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৫৩৮ টাকা।
অবচয়ের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের হিসাববছরের শুরুতে পুঞ্জীভূত অবচয় ছিল ৫১ কোটি ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪ টাকা। আলোচ্য বছরে নতুন করে অবচয় ব্যয় যুক্ত হয়েছে ২ কোটি ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৪ টাকা। ফলে বছর শেষে পুঞ্জীভূত অবচয় দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ১১ লাখ ৩২ হাজার ৪৮৮ টাকা।
অন্যদিকে আগের অর্থবছরের শুরুতে পুঞ্জীভূত অবচয় ছিল ৪৮ কোটি ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৫১৯ টাকা। ওই বছরে অবচয় ব্যয় হয়েছিল ২ কোটি ৯৪ লাখ ৫ হাজার ৫২৫ টাকা।
অর্থাৎ নতুন সম্পদ সংযোজনের পরিমাণ বাড়লেও এক বছরে অবচয় ব্যয় কমেছে ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ৮১ টাকা বা প্রায় ২৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
সম্পদের মোট ক্রয়মূল্য বাড়ার বিপরীতে অবচয় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত। তবে অবচয় ব্যয় কমার পুরো পরিমাণই অবচয় হার পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
২৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার পাওনা যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে গ্রাহক ও অন্যান্য পক্ষের কাছে পাওনা অর্থের হিসাব।
প্রতিবেদনের ৭ নম্বর টীকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির মোট হিসাবভুক্ত পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৯ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ৯১ লাখ ৭২ হাজার ৪৭১ টাকা।
অর্থাৎ এক বছরে পাওনা বেড়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ২৬৮ টাকা বা প্রায় ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোম্পানির দেওয়া পাওনার মেয়াদভিত্তিক তালিকা নির্ভরযোগ্য নয়। পাশাপাশি পাওনার হিসাব যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থনকারী নথিপত্রও পর্যাপ্ত ছিল না।
ফলে এসব পাওনার প্রকৃত অস্তিত্ব, হিসাবের নির্ভুলতা এবং আদায়যোগ্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট উপযুক্ত নিরীক্ষা প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি। একই সঙ্গে পাওনার বিপরীতে কোনো সমন্বয় কিংবা সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য সংস্থান রাখা প্রয়োজন কি না, সেটিও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
বিক্রির বিপরীতে পাওনা বেড়েছে, আদায় কমেছে
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের হিসাববছরের শুরুতে কোম্পানিটির পাওনা ছিল ২২ কোটি ৯১ লাখ ৭২ হাজার ৪৭১ টাকা। আলোচ্য বছরে বিক্রয়ের বিপরীতে নতুন করে ৩৫ কোটি ৫৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩৪ টাকা পাওনা যুক্ত হয়েছে। এতে মোট হিসাবভুক্ত পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ৪৮ লাখ ১২ হাজার ৫ টাকা।
এর বিপরীতে বছরজুড়ে পাওনা আদায় হয়েছে ৩৩ কোটি ১১ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৬ টাকা। ফলে ২০২৬ সালের ৩০ জুন অবশিষ্ট পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৯ টাকা।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের হিসাববছরের শুরুতে পাওনা ছিল ২১ কোটি ৯০ লাখ ৪৬ হাজার ২২৫ টাকা। ওই বছর বিক্রয়ের বিপরীতে নতুন করে ৩৪ কোটি ৭১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬০ টাকা পাওনা যুক্ত হয়েছিল। এতে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছিল ৫৬ কোটি ৬২ লাখ ১২ হাজার ৭৮৫ টাকা।
সেই বছরে পাওনা আদায় হয়েছিল ৩৩ কোটি ৭০ লাখ ৪০ হাজার ৩১৪ টাকা। ফলে ২০২৫ সালের ৩০ জুন অবশিষ্ট পাওনা ছিল ২২ কোটি ৯১ লাখ ৭২ হাজার ৪৭১ টাকা।
দুই বছরের হিসাব তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বিক্রয়ের বিপরীতে নতুন পাওনা যুক্ত হয়েছে আগের বছরের তুলনায় ৮৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৭৪ টাকা বেশি। বিপরীতে পাওনা আদায় কমেছে ৫৮ লাখ ৯১ হাজার ৪৮ টাকা।
অর্থাৎ নতুন পাওনা বাড়লেও আদায়ের পরিমাণ কমেছে। এর ফলে বছর শেষে কোম্পানিটির অনাদায়ী পাওনার পরিমাণ বেড়েছে।
ছয় থেকে ১২ মাস ধরে আটকে রয়েছে ৯ কোটি ১০ লাখ টাকা
কোম্পানির দেওয়া মেয়াদভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাস মেয়াদি পাওনার পরিমাণ ৯ কোটি ৯৯ লাখ ৪৩ হাজার ১১৯ টাকা। তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি পাওনা রয়েছে ৬ কোটি ২৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯৭ টাকা।
অন্যদিকে ছয় থেকে ১২ মাস মেয়াদি পাওনার পরিমাণ ৯ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৩ টাকা।
সব মিলিয়ে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৯ টাকা। এ হিসাবে মোট পাওনার প্রায় ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশ ছয় থেকে ১২ মাস মেয়াদি।
অর্থাৎ কোম্পানিটির মোট পাওনার এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে অনাদায়ী রয়েছে।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরীক্ষক নিজেই পাওনার মেয়াদভিত্তিক তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে এই তালিকায় দেখানো অর্থের প্রকৃত মেয়াদ ও যথার্থতাও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
কোম্পানির ব্যাখ্যায় এসব পাওনাকে জামানতবিহীন হলেও ভালো মানের পাওনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হিসাববছর শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ পাওনা আদায় হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এ দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় নিরীক্ষক পাওনার আদায়যোগ্যতা নিশ্চিত হতে পারেননি।
অনাদায়ী পাওনার বিপরীতে কোনো ক্ষতির সংস্থান নেই
আর্থিক প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচ্য হিসাববছরে অনাদায়ী পাওনার বিপরীতে কোনো ক্ষতির সংস্থান রাখেনি কোম্পানিটি।
কোম্পানির বক্তব্য অনুযায়ী, পাওনাগুলো ভালো মানের এবং হিসাববছর শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ অর্থ আদায় হয়েছে। এ কারণে কোনো সংস্থান রাখা হয়নি।
তবে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ বলছে, পাওনার হিসাব ও আদায়ের পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য নথিপত্র পাওয়া যায়নি। ফলে কোনো পাওনা অনাদায়ী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কি না এবং সে অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির সংস্থান প্রয়োজন কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
অর্থাৎ পাওনার গুণগত মান ও পরবর্তী সময়ে আদায়ের বিষয়ে কোম্পানি ইতিবাচক দাবি করলেও পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে নিরীক্ষক সেই দাবির যথার্থতা নিশ্চিত করতে পারেননি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানিটির পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা অন্য কোনো কর্মকর্তার কাছে এসব পাওনা অর্থের কোনো অংশ বকেয়া নেই।
অগ্রিম ও পাওনা মিলিয়ে ৩৭ কোটি ৫ লাখ টাকার হিসাব যাচাইয়ে সীমাবদ্ধতা
নাহি অ্যালুমিনিয়ামের আর্থিক বিবরণীতে দেখানো বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া অগ্রিম ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ৯৪৪ টাকা এবং হিসাবভুক্ত পাওনা ২৫ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৯ টাকা যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭ কোটি ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৮৩ টাকা।
অর্থাৎ প্রায় ৩৭ কোটি ৫ লাখ টাকার অগ্রিম ও পাওনার ক্ষেত্রে নিরীক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে।
তবে এই দুই হিসাবের নিরীক্ষাগত অবস্থান এক নয়। অগ্রিম অর্থের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না পাওয়ায় শর্তযুক্ত মতামত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পাওনার অস্তিত্ব, হিসাবের যথার্থতা ও আদায়যোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বারোপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
এর বাইরে কোম্পানিটির প্রায় ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের অবচয় হার পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক।
সব মিলিয়ে অগ্রিম, পাওনা ও স্থায়ী সম্পদের নিট মূল্য—এই তিন হিসাবখাতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ৮৭ লাখ ৭৪ হাজার ২৫ টাকা। তবে এই পুরো অর্থকে অনিয়ম, আত্মসাৎ কিংবা আর্থিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এগুলো সংশ্লিষ্ট হিসাবখাতের মোট পরিমাণ, যার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নিরীক্ষাগত সীমাবদ্ধতা ও হিসাবনীতি প্রয়োগের দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে।
শর্তযুক্ত মতামত বিনিয়োগকারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
নিরীক্ষকের শর্তযুক্ত মতামতের অর্থ হলো, আর্থিক প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ পাওয়া যায়নি অথবা হিসাবসংক্রান্ত ব্যতিক্রম রয়েছে। তবে এর অর্থ পুরো আর্থিক বিবরণীকে অবিশ্বস্ত ঘোষণা করা নয়।
নাহি অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষকে দেওয়া অগ্রিমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না পাওয়াই শর্তযুক্ত মতামতের মূল ভিত্তি। অন্যদিকে পাওনা অর্থের হিসাব এবং অবচয় হার পরিবর্তনের বিষয় দুটি বিশেষ গুরুত্বারোপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। নিরীক্ষক স্পষ্ট করেছেন, এসব বিশেষ গুরুত্বারোপের কারণে তাঁর মতামত অতিরিক্ত পরিবর্তিত হয়নি।
তবে বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অগ্রিম অর্থের যথার্থতা, পাওনা আদায়ের সম্ভাবনা এবং অবচয় ব্যয়ের সঠিক হিসাব সরাসরি কোম্পানির সম্পদ ও আর্থিক ফলাফল মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে অবচয় ব্যয় কমলে অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত থাকা সাপেক্ষে হিসাবভিত্তিক মুনাফা বাড়তে পারে। অন্যদিকে অনাদায়ী পাওনার বিপরীতে ভবিষ্যতে ক্ষতির সংস্থান করতে হলে কোম্পানির মুনাফা ও সম্পদের হিসাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কোম্পানির কাছে যেসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রয়োজন
প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও আর্থিক বিবরণীর তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, কাঁচামাল ও জমি কেনার জন্য দেওয়া ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অগ্রিমের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিরীক্ষকের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি কেন?
দ্বিতীয়ত, এসব অগ্রিমের বিপরীতে কোম্পানি কতটুকু পণ্য বা জমি বুঝে পেয়েছে এবং কত টাকা এখনো সমন্বয়ের অপেক্ষায় রয়েছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল পরিচালনা পর্ষদ অবচয় হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী সম্পদের ব্যবহারযোগ্য আয়ুষ্কাল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি কেন?
চতুর্থত, অবচয় হার পরিবর্তনের ফলে কোম্পানির বার্ষিক অবচয় ব্যয় ও মুনাফায় প্রকৃত প্রভাব কতটুকু পড়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, প্রায় ২৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার পাওনার বিপরীতে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য নথিপত্র না থাকার কারণ কী এবং পাওনার মেয়াদভিত্তিক তালিকাকে নিরীক্ষক কেন নির্ভরযোগ্য মনে করেননি?
ষষ্ঠত, কোম্পানি হিসাববছর শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ পাওনা আদায়ের দাবি করলেও তার পক্ষে নিরীক্ষক পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি কেন?
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পাওনার উল্লেখযোগ্য অংশ থাকা সত্ত্বেও অনাদায়ী পাওনার বিপরীতে কোনো ক্ষতির সংস্থান না রাখার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতাও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে নাহি অ্যালুমিনিয়ামের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে অগ্রিমের বিপরীতে নথিপত্রের ঘাটতি, পাওনা আদায়ের অনিশ্চয়তা এবং অবচয় হার পরিবর্তনের যথার্থতা নিয়ে নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এসব পর্যবেক্ষণকে প্রমাণিত আর্থিক জালিয়াতি বা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট লেনদেনের নথি, পাওনা আদায়ের প্রমাণ এবং অবচয় হার পরিবর্তনের বিস্তারিত হিসাব যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত আর্থিক চিত্র পরিষ্কার হতে পারে। এ অবস্থায় কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিটি অসংগতির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ করা জরুরি।






















