মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের বাজারদর যদি ফান্ডটির প্রকৃত সম্পদমূল্যের (NAV) চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তাহলে সেই বাড়তি দামে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিই দেখা গেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে। ফান্ডটির একটি ইউনিটের বাজারদর যেখানে ৩০ টাকা ৬০ পয়সা, সেখানে দিন শেষে এর প্রকৃত সম্পদমূল্য মাত্র ৯ টাকা। অর্থাৎ সম্পদমূল্যের তুলনায় বাজারে ইউনিটটি তিন গুণেরও বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। এ অবস্থায় মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দামও অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ফান্ডটির প্রতিটি ইউনিটের বাজারদর ছিল ২১ টাকা ৭০ পয়সা। এক মাসের ব্যবধানে সোমবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ এই সময়ে ইউনিটপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৯ টাকা বা ৪১ শতাংশ।
কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ফান্ডটির প্রকৃত সম্পদমূল্যের সামঞ্জস্য নেই। সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার দিন শেষে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য ছিল ৯ টাকা।
সহজভাবে বললে, কোনো বিনিয়োগকারী যদি ৩০ টাকা ৬০ পয়সা দিয়ে এই ফান্ডের একটি ইউনিট কেনেন, তাহলে ওই ইউনিটের বিপরীতে ফান্ডের প্রকৃত সম্পদের মূল্য রয়েছে মাত্র ৯ টাকা। অর্থাৎ বাজারদর ও সম্পদমূল্যের মধ্যে ব্যবধান ২১ টাকা ৬০ পয়সা।
আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফান্ডে বিনিয়োগ করা সম্পদের ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে ইউনিটপ্রতি সম্পদমূল্য প্রায় ১০ টাকা। অর্থাৎ সেই হিসাবেও ৩০ টাকা ৬০ পয়সার বাজারদর সম্পদমূল্যের প্রায় তিন গুণ। বরং ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে হিসাব করলে ফান্ডটির ইউনিটপ্রতি প্রায় ১ টাকা লোকসানে রয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে সাধারণত ফান্ডের সম্পদমূল্য বা নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। কারণ একটি ফান্ডের হাতে থাকা শেয়ার, বন্ড, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সম্পদের মূল্য হিসাব করে ইউনিটপ্রতি এই সম্পদমূল্য নির্ধারণ করা হয়। তাই বাজারে কোনো ইউনিটের দাম বাড়লেই যে ফান্ডটির প্রকৃত মূল্যও একই হারে বেড়েছে—বিষয়টি এমন নয়।
ধরা যাক, কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের একটি ইউনিটের প্রকৃত সম্পদমূল্য ১০ টাকা। কিন্তু বাজারে সেটি ৩০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। তখন একজন বিনিয়োগকারী ৩০ টাকা খরচ করে এমন একটি ইউনিট কিনছেন, যার বিপরীতে ফান্ডের প্রকৃত সম্পদের মূল্য ১০ টাকা। ফলে বাজারদর ও সম্পদমূল্যের এই ব্যবধান যত বেশি হবে, বিনিয়োগের ঝুঁকিও তত বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে বিএসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, সম্প্রতি বাজারে কোনো কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট প্রকৃত সম্পদমূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দামে লেনদেন হতে দেখা যাচ্ছে। বাজারমূল্য ও প্রকৃত সম্পদমূল্যের মধ্যে এমন অস্বাভাবিক ব্যবধান বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার বিষয়।
বিএসইসির মতে, মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রকৃত সম্পদমূল্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। কোনো ফান্ড নগদায়ন করা হলে বিনিয়োগকারীর প্রাপ্য অর্থ ওই ইউনিটের প্রকৃত সম্পদমূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু বাজারে ইউনিটের দাম দ্রুত বাড়ছে—এমন তথ্য দেখে বেশি দামে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিয়েছে, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের আগে ফান্ডটির প্রকৃত সম্পদমূল্য, মেয়াদ, বিনিয়োগের ধরন, পোর্টফোলিও এবং প্রকাশিত অন্যান্য তথ্য যাচাই করতে। শুধু বাজারদর বাড়ার খবর, গুজব কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্ররোচনায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্যও সতর্ক করেছে বিএসইসি।
অর্থাৎ, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু ‘দাম কত বাড়ছে’ সেটি নয়, বরং ‘দামের বিপরীতে ফান্ডের প্রকৃত সম্পদের মূল্য কত’—এই প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে বাজারদর ও প্রকৃত সম্পদমূল্যের বড় ব্যবধানকে সামনে রেখেই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে বিএসইসি।
























