ঢাকা   বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

পরিচালকদের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতিতেই পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৪৯, ১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

পরিচালকদের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতিতেই পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্র পরিচালকদের কার্যকর স্বাধীনতা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে জবাবদিহির ঘাটতিকে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিচালকদের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে কোম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়বে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে নজরদারি জোরদার হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সহজ হবে।

তবে এ জন্য প্রস্তাবিত নতুন করপোরেট সুশাসন বিধিমালা একবারে কঠোরভাবে কার্যকর না করে কোম্পানির আকার, ব্যবসার ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে করপোরেট সুশাসন শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক এ আলোচনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালক, পেশাজীবী, শিক্ষক, বিনিয়োগকারী ও সাংবাদিকরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার হোসেন সাদাত।

কেন পরিচালকদের জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ

আলোচনায় বক্তারা বলেন, একটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে পরিচালকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা ও জবাবদিহি না থাকলে স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

উদাহরণ হিসেবে বক্তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়টি তুলে ধরেন। কোনো কোম্পানি যদি পরিচালকের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করে, তাহলে সেই লেনদেনের প্রকৃত মূল্য, শর্ত ও যৌক্তিকতা স্পষ্টভাবে যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংজ্ঞা ও মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি অস্পষ্ট হলে স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তাই পরিচালনা পর্ষদ ও নিরীক্ষা কমিটির জন্য কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সব কোম্পানির জন্য একই নিয়ম নয়

বক্তারা বলেন, দেশের সব কোম্পানির আকার, ব্যবসার ধরন, পরিচালন কাঠামো ও ঝুঁকি এক নয়। ফলে ছোট ও বড়, উৎপাদনমুখী ও আর্থিক খাতের কোম্পানির ওপর একই ধরনের করপোরেট সুশাসনের নিয়ম চাপিয়ে দিলে তা বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এ কারণে কোম্পানির ধরন, সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সুশাসনের মানদণ্ড নির্ধারণের পরামর্শ দেন তারা। এতে একদিকে কোম্পানির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।

বিএসইসি কমিশনার হোসেন সাদাত বলেন, বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। একইসঙ্গে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সীমিত সম্পদ ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের অধিকার রক্ষা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে গঠনমূলক মতামতের ভিত্তিতে চলতি বছরের মধ্যে একটি বিনিয়োগবান্ধব করপোরেট সুশাসন কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

ধাপে ধাপে বিধিমালা বাস্তবায়নের পরামর্শ

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক জারিন মাহমুদ হোসেইন বলেন, নতুন করপোরেট সুশাসন বিধিমালা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের সংজ্ঞা এবং এসব লেনদেনের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি স্পষ্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, টেকসই অর্থায়ন এবং পরিবেশ ও সামাজিক বিষয়ক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। এতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক তথ্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও ধারণা পাবেন।

করপোরেট সুশাসন বিশেষজ্ঞ লোপা রহমান বলেন, পরিচালনা পর্ষদ ও নেতৃত্বের কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য আগে থেকেই স্পষ্ট মানদণ্ড থাকা দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন বলেন, প্রতিষ্ঠানের ধরন ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

পরিচালকদের দক্ষতা ও ব্যবসা সম্পর্কে জ্ঞান জরুরি

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ এ মামুন বলেন, কোম্পানির ভিন্নতা বিবেচনায় রেখেই করপোরেট সুশাসনের সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার।

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস বাংলাদেশের সভাপতি এম নুরুল আলম পরিচালকদের পেশাগত জ্ঞান এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্যবসা সম্পর্কে বাস্তব ধারণার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, পরিচালকদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

আইসিএবির এনফোর্সমেন্ট, তদন্ত ও শৃঙ্খলা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক আফসিন বাতেন বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্পষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকা দরকার।

বক্তারা বলেন, কোন ধরনের লেনদেনকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ ও নিরীক্ষা কমিটি যাতে এসব লেনদেন সহজে শনাক্ত, মূল্যায়ন ও যাচাই করতে পারে, সে ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার ও সাইবার ঝুঁকিতেও নজর

ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) সভাপতি মনির হোসেন বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পরিচালকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সিএমজেএফের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বলেন, কোম্পানিগুলোর নিয়ম পরিপালনে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি। একইসঙ্গে সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার রক্ষায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আলোচনায় বক্তাদের অভিমত ছিল, শুধু নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করলেই পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না। বিধিমালার পাশাপাশি পরিচালকদের স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনের কার্যকর নজরদারি, নিরীক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুরক্ষায় বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে জবাবদিহি কার্যকর হলে কোম্পানির সুশাসন শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির পরিবেশও উন্নত হতে পারে।

সর্বশেষ