ঢাকা   রোববার ০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

বাজার বাড়লেই কেনেন, কমলেই বিক্রি—ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের এমন প্রবণতা ডিএসইর তথ্যেই স্পষ্ট

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৫৯, ২ আগস্ট ২০২৬

বাজার বাড়লেই কেনেন, কমলেই বিক্রি—ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের এমন প্রবণতা ডিএসইর তথ্যেই স্পষ্ট

শেয়ারবাজারে দর বাড়ার সময় সবচেয়ে বেশি কেনাকাটায় সক্রিয় থাকেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। আবার বাজারে পতন শুরু হলেই তারাই সবচেয়ে বেশি শেয়ার বিক্রি করেন। অন্যদিকে বড় বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আচরণ ঠিক উল্টো। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহের বিনিয়োগকারীভিত্তিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স সূচক ১৬ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট বাড়ার দিনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মোট ৯৪৩ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। একই সময়ে তারা বিক্রি করেছেন ৯০৮ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে দিন শেষে তাদের নিট ক্রয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে একই দিনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ৬৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকার শেয়ার কিনলেও বিক্রি করেছেন প্রায় ৯২ কোটি টাকার। ফলে তাদের নিট বিক্রি হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। গত দুই সপ্তাহের বেশিরভাগ কার্যদিবসেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আল-আমীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা ছিল যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ বিশ্লেষণভিত্তিক বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিনিয়োগ করেন না। ডিএসইর সাম্প্রতিক তথ্য সেই ধারণাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

তিনি মনে করেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যদি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত না নেন, তাহলে তাদের এই আচরণের সুযোগ নিয়ে কারসাজিকারী গোষ্ঠী, বড় বিনিয়োগকারী এবং অভিজ্ঞ বাজারসংশ্লিষ্টরা সহজেই মুনাফা করে নিতে পারবেন।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দখলেই লেনদেনের বড় অংশ

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ১৯ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত মোট ১০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ৯ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৮৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। কেনার ক্ষেত্রে তাদের অংশ ছিল ৮৯ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং বিক্রির ক্ষেত্রে ৮৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, গত সপ্তাহে বাজারের প্রধান সূচক প্রায় ৯১ পয়েন্ট বাড়লেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা মোট লেনদেনে প্রায় সাড়ে ২৫ কোটি টাকার নিট শেয়ার কিনেছেন। এর আগের সপ্তাহে সূচক প্রায় ৯৬ পয়েন্ট কমে গেলেও তারাও ২২০ কোটির বেশি টাকার নিট শেয়ার সংগ্রহ করেছেন।

মুনাফা তুলে নিচ্ছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা

ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মোট ৮০৩ কোটি টাকার লেনদেন করলেও নিট প্রায় সাড়ে ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। আগের সপ্তাহেও প্রায় ৯০৫ কোটি টাকার লেনদেনের বিপরীতে তাদের নিট বিক্রি ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

বাজার টানা কয়েক মাস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ব্রোকারেজ হাউসের অংশগ্রহণ সীমিত

ডিএসইর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রোকারেজ হাউসগুলো নিজেদের হিসাবে খুব অল্প পরিমাণ শেয়ার কেনাবেচা করে। গত দুই সপ্তাহে মোট লেনদেনের মাত্র ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ ছিল তাদের অংশ।

এ সময়ে তারা প্রায় ১৬০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে এবং প্রায় ১৭৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকাকালে ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিক্রির তুলনায় কিছুটা বেশি শেয়ার কিনেছে। তবে আগের সপ্তাহে যখন বাজারে দরপতন হয়েছিল, তখন তাদের বিক্রির পরিমাণই বেশি ছিল।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ অব্যাহত

ডিএসইর তথ্য বলছে, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে কমছে।

গত দুই সপ্তাহে তারা ২১ কোটি টাকারও কম মূল্যের শেয়ার কিনলেও বিক্রি করেছেন প্রায় ১১২ কোটি টাকার শেয়ার।

এর মধ্যে গত সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪১ কোটি টাকার শেয়ার। আর তার আগের সপ্তাহে প্রায় ১৯ কোটি টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭০ কোটিরও বেশি।

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাজারে লেনদেনের প্রধান চালিকাশক্তি এখনও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই। তবে তাদের অনেকেই বাজারের গতিধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে কৌশলগতভাবে শেয়ার কেনাবেচা করে মুনাফা তুলে নেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।