ঢাকা   শনিবার ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

ছোট ঋণেই বাড়ছে খেলাপির ঝুঁকি, এক বছরে তালিকায় যুক্ত প্রায় ২৪ লাখ নতুন গ্রাহক

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৮, ১ আগস্ট ২০২৬

ছোট ঋণেই বাড়ছে খেলাপির ঝুঁকি, এক বছরে তালিকায় যুক্ত প্রায় ২৪ লাখ নতুন গ্রাহক

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ এখন শুধু বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষুদ্র ও স্বল্প অঙ্কের ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের মধ্যেও খেলাপি হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এক কোটি টাকার কম ঋণধারী খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, যা খুচরা ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এক কোটি টাকার নিচে ঋণ রয়েছে এমন খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জন। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩। অর্থাৎ মাত্র ১২ মাসে প্রায় ২৪ লাখ নতুন গ্রাহক খেলাপির কাতারে যোগ দিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সংসারের বাড়তি ব্যয়, পারিবারিক ঋণের চাপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় মন্দা এবং কৃষি আয় কমে যাওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিএমএসএমই, কৃষি, আবাসন ও ব্যক্তিগত ঋণে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির কারণ হলেও স্বল্প অঙ্কের ঋণে ব্যাপক হারে খেলাপি বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের ভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণের প্রায় ১৫ শতাংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়েছে। সিএমএসএমই খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এ খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি অনাদায়ী হয়ে গেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে কুটির শিল্প, যেখানে খেলাপির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ।

একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বড় ঋণেও চাপ কমেনি। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ খেলাপি। এক বছর আগে এ শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহক ছিল ১ হাজার ৪৭৮ জন, যা মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৫ জনে।

অন্যান্য ঋণ শ্রেণিতেও খেলাপির হার ঊর্ধ্বমুখী। এক থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ২৬ শতাংশের বেশি। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে তা প্রায় ৪৫ শতাংশ। ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকায় প্রায় ৩৬ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য খাত। এ খাতে বিতরণ করা ঋণের ৪৪ শতাংশই এখন খেলাপি। শিল্প খাতে অনাদায়ী ঋণের হার প্রায় ৩২ শতাংশ। নির্মাণ এবং কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন—উভয় খাতেই প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণ নিয়মিত নেই। তুলনামূলকভাবে ভোক্তা ঋণে খেলাপির হার সবচেয়ে কম, প্রায় ৭ শতাংশ।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ মানুষের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশ কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বলেন, আগে বড় ঋণেই খেলাপির ঝুঁকি বেশি দেখা গেলেও এখন কৃষি ও এসএমই খাতেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শাখা পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং নিয়মিতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল মেহেদী বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে খুব দ্রুত তারল্য সংকটে পড়েন। কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তাই ছোট ঋণে খেলাপি বাড়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে।