শেয়ারবাজারে প্রকৌশল খাতের অন্যতম বড় কোম্পানি বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে এবং ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। প্রথম নজরে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক মনে হলেও আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে, মুনাফার বিপরীতে কোম্পানির ঋণের চাপ কতটা স্বস্তিদায়ক?
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রায় ৩ হাজার ১২৯ কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এই ঋণের অঙ্ক কোম্পানির এক বছরের নিট মুনাফার প্রায় পাঁচ গুণের বেশি।
এছাড়া বিএসআরএম ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা নিট মুনাফা করলেও এর বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঘোষণা করেছে মাত্র ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ। পরিশোধিত মূলধনের ভিত্তিতে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা মোট নিট মুনাফার প্রায় ২৪.৩ শতাংশ। অর্থাৎ কোম্পানিটি অর্জিত মুনাফার প্রায় ৭৫.৭ শতাংশ, বা ৪৬৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা নিজেদের কাছেই রেখে দিচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যখন একটি কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মুনাফা করছে, তখন সেই মুনাফার তুলনায় শেয়ারহোল্ডারদের অংশ কতটা যৌক্তিক? কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও, উচ্চ মুনাফার তুলনায় নগদ লভ্যাংশ কম হওয়ায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একাংশ প্রত্যাশিত নগদ রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কি না—সে প্রশ্নও বাজারে আলোচনায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদনমুখী শিল্পে ঋণ নেওয়া স্বাভাবিক। তবে যখন স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বড় হয়ে যায়, তখন সুদের ব্যয়, ব্যাংকঋণ নবায়নের চাপ এবং কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনা কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের পরিবেশে এই চাপ ভবিষ্যতের মুনাফার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও একটি বিষয় বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা করছে এবং নগদ লভ্যাংশও দিচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে বিপুল অঙ্কের স্বল্পমেয়াদি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা পুরোপুরি কমেনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অপারেশনাল ক্যাশ ফ্লো কি ঋণনির্ভর ব্যবসার চাপ কমানোর জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী, নাকি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এখনও বড় পরিসরে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে?
সর্বশেষ নিরীক্ষিত হিসাবে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১৬৬ টাকা ৭৯ পয়সা, রিজার্ভ ও উদ্বৃত্ত প্রায় ৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৪৭.১২ শতাংশ শেয়ার। এসব তথ্য কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিকে শক্তিশালী বলে ইঙ্গিত দেয়।
তবে পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ইপিএস, লভ্যাংশ বা কম পিই অনুপাত দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে ঋণের পরিমাণ, সুদের ব্যয়, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ দায় পরিশোধের সক্ষমতাও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিএসআরএমের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মুনাফা নয়; বরং উচ্চ ঋণনির্ভর ব্যবসায়িক কাঠামো আগামী বছরগুলোতে কতটা টেকসই থাকবে?
এ ব্যাপারে জানতে বিএসআরএম-এর কোম্পানি সেক্রেটারি শেখর রঞ্জন করকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
























