ঢাকা   বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১০ ঝুঁকি দেখছে এডিবি

অর্থ ও বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১৬:৫৯, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১০ ঝুঁকি দেখছে এডিবি

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে ১০ ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে নতুন করে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিধিনিষেধ বাড়ার আশঙ্কা।

এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ, ব্যাংক খাতে নতুন সংকট, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, প্রত্যাশার তুলনায় কম উন্নয়ন ব্যয় এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগকেও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এডিবির মতে, এসব ঝুঁকি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস

এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এ হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও কমিয়েছে সংস্থাটি।

তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমলে ভোগব্যয় ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে এডিবি।

এডিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এর পরের অর্থবছরে তা ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত এডিবির মিশন প্রধান চিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের দিকে এগোতে শুরু করেছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই পুনরুদ্ধার এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।

তিনি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে দ্রুত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার এগোলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে বাড়তি চাপ

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও সতর্ক করেছে এডিবি। সংস্থাটির সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে থাকতে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে যা ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশই।

এডিবির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।

চলতি হিসাবের ঘাটতিও বাড়ার আশঙ্কা

চলতি হিসাবের ভারসাম্য নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হলে আগামী অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে।

এ ছাড়া উচ্চ সুদহার, ঋণপ্রাপ্তির কঠিন পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

যে ১০ ঝুঁকি দেখছে এডিবি

এডিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিগুলো হলো—

১. মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া
২. আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়া
৩. বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে নতুন করে বিঘ্ন সৃষ্টি
৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিধিনিষেধ ও অনিশ্চয়তা
৫. প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া
৬. ডলারের বিপরীতে টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকা
৭. ব্যাংক খাতে নতুন করে সংকট তৈরি হওয়া
৮. রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব
৯. প্রত্যাশার তুলনায় কম উন্নয়ন ব্যয়
১০. জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রভাব

সব মিলিয়ে এডিবির পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হলেও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ একাধিক ঝুঁকি সেই প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতির ওপর অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।