ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। যদিও বৃহস্পতিবার সকালে কিছুটা দরপতন হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনো ১০২ ডলারের বেশি।
সর্বশেষ হিসাবে, ব্রেন্টের দাম ১ দশমিক ১৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৮ ডলারে নেমেছে। এর আগে বুধবার টানা পাঁচ কার্যদিবসের দরপতনের ধারা ভেঙে ব্রেন্টের দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১০৩ দশমিক ৮ ডলারে ওঠে। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—ডব্লিউটিআই—ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৯২ দশমিক ১৬ ডলারে দাঁড়ায়।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ
তেলের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে কোনো ধরনের বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ না করার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের পর বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় এবং তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়।
তবে এর মধ্যেই ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রত্যাহারের প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। এই ঘোষণার পর তেলের দাম সাময়িকভাবে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। ফলে বাজারে এখন মূল প্রশ্ন—মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়বে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
নজর এখন ওয়াশিংটন-তেহরানের দিকে
তেলের বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেন, ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক ‘খুব ভালো’ হয়েছে।
তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে সমঝোতা অথবা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ—দুই ধরনের সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরেছেন।
ফলে বাজারে একদিকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সপ্তাহের হিসাবে বাজারে চাপ
বুধবার দাম বাড়লেও পুরো সপ্তাহের হিসাবে তেলের বাজার এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ব্রেন্টের দাম কমেছে প্রায় ১ শতাংশ।
অর্থাৎ, সাম্প্রতিক উত্থান সত্ত্বেও বাজারে স্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিটি পরিবর্তনেই তেলের দামে দ্রুত ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে টাকায় কত দাম?
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার হলে প্রতি লিটারের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৬৪ সেন্ট। এক ডলারের দাম ১২৩ টাকা ধরলে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি লিটার অপরিশোধিত তেলের দাম হয় প্রায় ৭৯ টাকা।
তবে এটি শুধু অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য। এর সঙ্গে পরিবহন, বিমা, বন্দর, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারের শুল্ক-কর যুক্ত হয়। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই দেশে জ্বালানি তেলের চূড়ান্ত বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের নিজস্ব তেল পরিশোধন সক্ষমতা সীমিত। দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন তেল পরিশোধনের সক্ষমতা থাকলেও আমদানি করতে হয় প্রায় ৭০ লাখ টন।
ফলে দেশের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণে পরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব দেশের আমদানি ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বাজারেও পড়তে পারে।
এ কারণে এখন তেলের বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কোন দিকে যায় এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন কতটা স্বাভাবিক থাকে।
























