ঢাকা   সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

নবম পে স্কেল দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ আইএমএফের, সিদ্ধান্তে অনড় নয় সরকার

অর্থ ও বাণিজ্য

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:২০, ২৭ জুলাই ২০২৬

নবম পে স্কেল দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ আইএমএফের, সিদ্ধান্তে অনড় নয় সরকার

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আদায় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন পে স্কেল অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সরকার এখনই সেই প্রস্তাব মেনে নিচ্ছে না। বরং বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

অর্থ বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঢাকা সফরে আসা আইএমএফের প্রতিনিধি দল অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে নবম পে স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর হলে সরকারের প্রতি বছরের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে, মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংস্থাটি অন্তত দুই বছর সময় নিয়ে পে স্কেল বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে।

সহজভাবে বুঝুন

ধরুন, একটি পরিবারের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু তারা একবারেই এমন সিদ্ধান্ত নিল, যাতে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা খরচ হবে। আয় না বাড়িয়ে হঠাৎ এত বড় ব্যয় বাড়ালে পরিবারকে হয় ঋণ নিতে হবে, নয়তো অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে। আইএমএফের মতে, সরকারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে যদি পর্যাপ্ত রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়াই নতুন বেতন কাঠামো চালু করা হয়।

সূত্রগুলো আরও জানায়, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসতে পারে। এরপর নভেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে নতুন ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি নবম পে স্কেল নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করতে চায়।

তবে সরকারের পরিকল্পনা হলো, ওই বৈঠকের আগেই নবম পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ করা। এতে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন করে বড় ইস্যু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠকে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে সচিব কমিটির সুপারিশ, সম্ভাব্য বেতন কাঠামো, বাস্তবায়নের আর্থিক প্রভাব এবং সরকারের সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, পে স্কেল-সংশ্লিষ্ট ফোকাল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয় এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরও বিশ্লেষণ করে সুপারিশ দেওয়ার নির্দেশনা দেন।

এদিকে অর্থ বিভাগ নবম পে স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা আগামী সপ্তাহের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার নীতিগতভাবে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চায় না। তবে একবারে পুরো বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে এটি কার্যকর করা যায়, সে পথও খোঁজা হচ্ছে।

কেন নতুন পে স্কেলের দাবি?

বর্তমান অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষার খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী এর আওতায় আসবেন। প্রস্তাবিত কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় আইএমএফের মত হলো, বড় ধরনের স্থায়ী সরকারি ব্যয় বাড়ানোর আগে রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি এবং অর্থনীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি ভালোভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।