একই সময়ে কোনো কোম্পানি দিচ্ছে ৭৭ শতাংশ নগদ ডিভিডেন্ড, কোনোটি ৩২.৫০ শতাংশ, আবার লোকসানে থাকা কোম্পানি দিচ্ছে শূন্য ডিভিডেন্ড। বিদায়ী সপ্তাহে তালিকাভুক্ত কয়েকটি কোম্পানির ডিভিডেন্ড ঘোষণায় এমনই চিত্র দেখা গেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু ডিভিডেন্ডের হার নয়; বরং কোম্পানি কত টাকা আয় করেছে, সেই আয় থেকে কতটা নগদ এসেছে এবং ডিভিডেন্ড দেওয়ার পরও কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী থাকছে—সেটিই আসল।
সহজ উদাহরণে বলা যায়, দুটি কোম্পানির একটি যদি ১০০ টাকা আয় করে ৭০ টাকা ডিভিডেন্ড দেয়, আর অন্যটি ১০০ টাকা আয় করে ৩০ টাকা ডিভিডেন্ড দেয়, তাহলে শুধু ডিভিডেন্ডের হার দেখে প্রথম কোম্পানিকে ভালো বলা যাবে না। প্রথম কোম্পানির হাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কম টাকা থাকতে পারে। আবার কোনো কোম্পানি বেশি ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও যদি তার নগদ প্রবাহ দুর্বল হয়, তাহলে সেই ডিভিডেন্ডের মান নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ৭৭ শতাংশ, এনভয় টেক্সটাইলস ৩২.৫০ শতাংশ, এপেক্স ফুটওয়্যার ৩০ শতাংশ এবং বঙ্গজ ৩ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে তাল্লু স্পিনিং কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি।
ইবনে সিনা: ডিভিডেন্ডও বাড়ল, মুনাফাও বাড়ল
ডিভিডেন্ডের তালিকায় সবচেয়ে বেশি ৭৭ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস।
আগের অর্থবছরে কোম্পানিটি ৬৪ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। অর্থাৎ এবার ডিভিডেন্ডের হার বেড়েছে ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
শুধু ডিভিডেন্ড নয়, কোম্পানিটির মুনাফাতেও উন্নতি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ছিল ২০ টাকা ২৭ পয়সা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৫ টাকা ৪৩ পয়সা।
অর্থাৎ, কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বেড়েছে প্রায় ৫ টাকা ১৬ পয়সা।
এখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক দিক হলো—ডিভিডেন্ড বৃদ্ধির সঙ্গে মুনাফাও বেড়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো নগদ প্রবাহ। কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নগদ কার্যকরী প্রবাহ বা এনওসিএফপিএস বেড়ে হয়েছে ৩৭ টাকা ৯৫ পয়সা, যেখানে আগের বছর ছিল ২৩ টাকা ১৬ পয়সা।
অর্থাৎ, হিসাবের মুনাফার পাশাপাশি ব্যবসা থেকে আসা নগদ অর্থের প্রবাহও বেড়েছে।
৩০ জুন ২০২৬ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১৪৪ টাকা ৫৬ পয়সা।
কোম্পানিটির এজিএম হবে আগামী ২৩ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায়। ডিভিডেন্ড পাওয়ার যোগ্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণে রেকর্ড ডেট ২৬ অক্টোবর।
বিনিয়োগকারীর জন্য বার্তা
ইবনে সিনার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে—মুনাফা বেড়েছে, নগদ প্রবাহ বেড়েছে এবং ডিভিডেন্ডও বেড়েছে। ফলে শুধু উচ্চ ডিভিডেন্ড নয়, ডিভিডেন্ডের পেছনে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এনভয় টেক্সটাইলস: ডিভিডেন্ড বেশি, তবে মুনাফা কিছুটা কমেছে
এনভয় টেক্সটাইলস ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩২.৫০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোম্পানিটির ইপিএস আগের বছরের ৮ টাকা ৪০ পয়সা থেকে কমে ৮ টাকা ২৪ পয়সা হয়েছে।
অর্থাৎ ডিভিডেন্ড ভালো হলেও মুনাফা সামান্য কমেছে।
তবে নগদ প্রবাহের চিত্র বেশ শক্তিশালী। এনওসিএফপিএস ৪ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বেড়ে ১৪ টাকা ৮৮ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে এনএভিপিএসও ৫৮ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা ৩৩ পয়সা হয়েছে।
এখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো—ডিভিডেন্ড বেশি হলেই শুধু কোম্পানির বর্তমান অবস্থাকে বিচার করা যাবে না; মুনাফা কেন কমেছে এবং নগদ প্রবাহ কেন বেড়েছে, সেটিও দেখতে হবে।
কোম্পানিটির রেকর্ড ডেট ২৬ অক্টোবর এবং এজিএম হবে আগামী ৫ ডিসেম্বর।
এপেক্স ফুটওয়্যার: ক্যাশের পাশাপাশি বোনাস শেয়ার
এপেক্স ফুটওয়্যার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মোট ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে ১৫ শতাংশ ক্যাশ এবং ১৫ শতাংশ স্টক বা বোনাস ডিভিডেন্ড।
সহজভাবে বললে, ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ১ টাকা ৫০ পয়সা নগদ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতি ১০০টি শেয়ারের বিপরীতে ১৫টি বোনাস শেয়ার পাওয়া যাবে।
কোম্পানিটির পুনঃনির্ধারিত ইপিএস ৬ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৯১ পয়সা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বড় সতর্কতার জায়গা রয়েছে—কোম্পানিটির পুনঃনির্ধারিত এনওসিএফপিএস ঋণাত্মক ৯৬ টাকা ৯৭ পয়সা হয়েছে। আগের বছরও এই সূচক ছিল ঋণাত্মক ৪৫ টাকা ১৯ পয়সা।
অর্থাৎ মুনাফা বাড়লেও পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহের চিত্র দুর্বল।
তাই বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে শুধু ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানির নগদ প্রবাহের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে কোম্পানিটির এনএভি বেড়ে হয়েছে ৩৫৫ টাকা ২৫ পয়সা, যা আগের বছর ছিল ৩৪৯ টাকা ৩৫ পয়সা।
রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ অক্টোবর ২০২৬।
বঙ্গজ: ডিভিডেন্ড মাত্র ৩%, আয়ও কমেছে
বঙ্গজ দিয়েছে ৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড।
কোম্পানিটির ইপিএস আগের বছরের ২৮ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ২৪ পয়সা।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো নগদ প্রবাহ। এনওসিএফপিএস আগের বছরের ৩৮ পয়সা থেকে কমে ঋণাত্মক ৫২ পয়সায় নেমেছে।
অর্থাৎ কোম্পানির আয় কমার পাশাপাশি ব্যবসা থেকে নগদ অর্থের প্রবাহও দুর্বল হয়েছে।
তবে এনএভিপিএস সামান্য বেড়ে ২১ টাকা ১০ পয়সা হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২১ টাকা ২ পয়সা।
কোম্পানিটির রেকর্ড ডেট ১৯ অক্টোবর এবং এজিএম হবে ১২ নভেম্বর।
বিনিয়োগকারীর জন্য বার্তা
বঙ্গজের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ ডিভিডেন্ডকে আলাদা করে না দেখে আয় ও নগদ প্রবাহের দুর্বলতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাল্লু স্পিনিং: লোকসান, তাই ডিভিডেন্ড শূন্য
বিদায়ী সপ্তাহে সবচেয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে তাল্লু স্পিনিংয়ে। কোম্পানিটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেনি।
কারণ কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২ টাকা ৮৪ পয়সা। আগের বছরও লোকসান ছিল ২ টাকা ৭৯ পয়সা।
অর্থাৎ লোকসান আরও বেড়েছে।
এনএভিপিএসও আগের বছরের ১৩ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে কমে ১০ টাকা ৫১ পয়সায় নেমেছে।
তবে এনওসিএফপিএস সামান্য উন্নতি করেছে। আগের বছর ঋণাত্মক ৩ পয়সা থেকে এবার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ০.০০৭ টাকা হয়েছে।
রেকর্ড ডেট ১৯ অক্টোবর এবং এজিএম হবে ১২ নভেম্বর।
ডিভিডেন্ড না দেওয়ার অর্থ কী?
ডিভিডেন্ড না দেওয়া সবসময় খারাপ নয়। কোনো কোম্পানি যদি ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য নগদ অর্থ ধরে রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে তা থেকে আয় বাড়তে পারে।
কিন্তু তাল্লু স্পিনিংয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখতে হবে। এখানে কোম্পানিটি লোকসানে রয়েছে এবং এনএভিও কমেছে। তাই ডিভিডেন্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কোম্পানির দুর্বল আর্থিক অবস্থার সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শুধু ডিভিডেন্ড দেখলেই ভুল হতে পারে
এই সপ্তাহের পাঁচ কোম্পানির তথ্য থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
৭৭ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানি আর ৩ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানিকে একইভাবে বিচার করা যাবে না। আবার ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানিকেও শুধু ডিভিডেন্ডের হার দেখে ভালো বলা যাবে না।
বিনিয়োগের আগে অন্তত পাঁচটি বিষয় দেখা জরুরি—
১. EPS বা শেয়ারপ্রতি আয়: কোম্পানি আসলে কত আয় করছে?
২. ডিভিডেন্ড: আয়ের কত অংশ শেয়ারহোল্ডারদের দিচ্ছে?
৩. NOCFPS: মুনাফার বিপরীতে বাস্তবে ব্যবসা থেকে কত নগদ আসছে?
৪. NAVPS: কোম্পানির সম্পদের বিপরীতে শেয়ারপ্রতি নিট মূল্য কত?
৫. ঋণ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসা: কোম্পানির ঋণের চাপ কত এবং সামনে ব্যবসা বাড়ানোর সক্ষমতা কেমন?
একটি কোম্পানি ৫০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিলেও যদি তার নগদ প্রবাহ দুর্বল হয়, তাহলে সতর্ক হতে হবে। আবার ২০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া কোনো কোম্পানির মুনাফা, নগদ প্রবাহ ও ব্যবসা ধারাবাহিকভাবে বাড়লে সেটিও বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
চলতি সপ্তাহে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করবে ৭ কোম্পানি
এদিকে চলতি সপ্তাহে আরও ৭টি কোম্পানি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারে।
কোম্পানিগুলো হলো—সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ডরিন পাওয়ার, এপেক্স স্পিনিং, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ফাইন ফুডস, ইস্টার্ন হাউজিং এবং এপেক্স ফুডস।
৪ অক্টোবর
বিকাল ৩টায় এপেক্স স্পিনিং এবং সাড়ে ৩টায় এপেক্স ফুডসের বোর্ড সভা।
৫ অক্টোবর
বিকাল সাড়ে ৩টায় ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বোর্ড সভা।
৭ অক্টোবর
বিকাল সাড়ে ৪টায় ফাইন ফুডসের বোর্ড সভা।
৮ অক্টোবর
দুপুর আড়াইটায় অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ এবং বিকাল সাড়ে ৩টায় ডরিন পাওয়ারের বোর্ড সভা।
১০ অক্টোবর
বিকাল সাড়ে ৪টায় সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের বোর্ড সভা।
তবে বোর্ড সভার আগে ডিভিডেন্ডের হার নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই বিনিয়োগকারীদের গুজব বা অনুমানের পরিবর্তে কোম্পানির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, আর্থিক ফলাফল এবং ডিভিডেন্ডের পাশাপাশি EPS ও নগদ প্রবাহের তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
কারণ শেয়ারবাজারে আসল প্রশ্ন শুধু ‘কত শতাংশ ডিভিডেন্ড?’ নয়—বরং ‘কোম্পানি সেই ডিভিডেন্ড দেওয়ার মতো আয় ও নগদ অর্থ তৈরি করতে পারছে কি না।’






















