ঢাকা   রোববার ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

তেলের দাম ও বন্ডের ইল্ড বাড়ায় শেয়ারবাজারে চাপের শঙ্কা

শেয়ারবাজার

শেয়ারবিজনেস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫৯, ৪ অক্টোবর ২০২৬

তেলের দাম ও বন্ডের ইল্ড বাড়ায় শেয়ারবাজারে চাপের শঙ্কা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, বাড়ছে সরকারি বন্ডের ইল্ডও। আর এই দুইয়ের প্রভাব গিয়ে পড়তে পারে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও শেয়ারবাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে শুক্রবার এশিয়ার বেশ কয়েকটি শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে এবং সুদের হার কমানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ইয়েল্ড বেশি থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ারবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বন্ডে নিতে পারেন।

পুরো বিষয়টি সহজে বোঝা যাক

ধরা যাক, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি তেল আমদানি করে, তাই তেল কিনতে দেশের বেশি ডলার খরচ হবে।

এর ফলে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়তে পারে। যেমন—একটি কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ল। কোম্পানিটি তখন হয় পণ্যের দাম বাড়াবে, নয়তো বাড়তি খরচ নিজেই বহন করবে। দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে, আর খরচ নিজে বহন করলে কোম্পানির মুনাফা কমবে।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার কমানো কঠিন হয়ে যায়।

এবার দ্বিতীয় ধাপটি দেখুন—সুদের হার বেশি থাকলে ঋণের খরচও বেশি থাকে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো কোম্পানি যদি ১০০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে, সুদের হার বেড়ে গেলে ওই ঋণের বিপরীতে কোম্পানিকে আগের তুলনায় বেশি সুদ দিতে হবে। এতে মুনাফা কমে যেতে পারে এবং শেয়ারটির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারের একটি ঘটনা—তেলের দাম বৃদ্ধি—শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো কোম্পানির মুনাফা এবং শেয়ারের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বন্ডের ইয়েল্ড বাড়লে শেয়ারবাজারে সমস্যা কোথায়?

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বন্ডের ইয়েল্ড।

সহজ ভাষায়, একটি দেশের সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে যদি তুলনামূলক বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বেশি ঝুঁকির শেয়ারবাজারে অর্থ রাখার আগ্রহ কমাতে পারেন।

ধরা যাক, কোনো বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে অনিশ্চিতভাবে ৮-১০ শতাংশ রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডে তুলনামূলক আকর্ষণীয় রিটার্ন পাওয়া গেলে তিনি ঝুঁকি না নিয়ে বন্ড বেছে নিতে পারেন।

বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি উদীয়মান বাজার থেকে অর্থ সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো তুলনামূলক নিরাপদ বাজারে নিয়ে যান, তাহলে বাংলাদেশের মতো বাজারে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমতে পারে।

কেন তেলের দাম নিয়ে এত উদ্বেগ?

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংকট নিরসনে এখনো সমঝোতা না হওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও সেনা পাঠাচ্ছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণেই বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা—তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে আবারও পণ্যমূল্যনির্ভর মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।

ফরেক্স ডটকমের ফাওয়াদ রাজাকজাদার মতে, বাজার এখন জুন ২০২৭-এর মধ্যে ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে আরও চার দফা সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় নিচ্ছে। অথচ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আগে বাজারের প্রত্যাশা ছিল ওই সময়ের মধ্যে অন্তত ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমার।

অর্থাৎ, কয়েক মাসের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পুরোপুরি বদলে গেছে।

বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে কী দেখা যাচ্ছে?

এই উদ্বেগের প্রভাব এশিয়ার শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে।

শুক্রবার হংকংয়ের বাজারে ২ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। টোকিও, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন, ম্যানিলা ও জাকার্তার বাজারও কমেছে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া, সিডনি ও তাইপের বাজার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ তৈরি হলেও সব দেশের শেয়ারবাজার একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কোথায় চাপ আসতে পারে?

বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যেতে পারে কয়েকটি জায়গায়।

প্রথমত, আমদানিনির্ভর কোম্পানি।

তেলের দাম ও ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। যেসব কোম্পানি কাঁচামাল বা জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ও ঋণনির্ভর কোম্পানি।

সুদের হার বেশি থাকলে ঋণের খরচ বাড়ে। ফলে যেসব কোম্পানির বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণ রয়েছে, তাদের সুদ ব্যয় বাড়তে পারে এবং মুনাফায় চাপ পড়তে পারে।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত।

জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে এই খাতের ব্যয় ও নগদ প্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে কোম্পানিভেদে সরকারি নীতি, মূল্য সমন্বয় ও চুক্তির ধরন অনুযায়ী প্রভাব আলাদা হবে।

চতুর্থত, শিল্পখাত।

কাঁচামাল, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে। কোম্পানি যদি বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে, তাহলে সরাসরি মুনাফায় চাপ পড়তে পারে।

তাহলে কি সব শেয়ারের দাম কমবে?

অবশ্যই নয়।

এটাই বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একই বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিভিন্ন কোম্পানির ওপর ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, কোনো কোম্পানি যদি রপ্তানিমুখী হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রায় আয় করে, তাহলে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার দুর্বলতা কিছু ক্ষেত্রে তার আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আবার কোনো কোম্পানির ঋণ কম এবং নগদ অর্থের অবস্থান শক্তিশালী হলে সুদের হার বাড়লেও তার ওপর চাপ তুলনামূলক কম হতে পারে।

অন্যদিকে যেসব কোম্পানির ঋণ বেশি, আমদানি নির্ভরতা বেশি এবং উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

তাই শুধু ‘বিশ্ববাজারে দরপতন হয়েছে’—এই খবর দেখে সব শেয়ার বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং কোম্পানির ঋণ, সুদ ব্যয়, আমদানি নির্ভরতা, রপ্তানি আয়, মুনাফা এবং নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক সীমিত হলেও তাদের লেনদেন বাজারের মনোভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ইয়েল্ড বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তখন তারা উদীয়মান বাজারে নতুন বিনিয়োগ কমাতে বা বিদ্যমান বিনিয়োগের কিছু অংশ তুলে নিতে পারেন।

এতে বাংলাদেশের বাজারে তারল্য কমতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এখন কোন তথ্যগুলোর দিকে নজর রাখবেন?

বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের আগামী দিনগুলোতে শুধু ডিএসই সূচক বা দৈনিক লেনদেন দেখলেই হবে না। বরং কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূচকের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

১. আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম
দাম কতটা বাড়ছে এবং কত দিন উচ্চ পর্যায়ে থাকছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ।

২. যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড
ইয়েল্ড বাড়লে নিরাপদ সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।

৩. ফেডের সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা
সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমছে নাকি বাড়ছে—তার ওপর বৈশ্বিক বাজারের দিক অনেকটাই নির্ভর করবে।

৪. ডলারের বিনিময় হার
ডলার শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের খরচে প্রভাব পড়তে পারে।

৫. দেশের মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার
আন্তর্জাতিক চাপ দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কতটা প্রবেশ করছে, তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোলস বা কৃষি খাতের বাইরের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে।

এই তথ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার কতটা শক্তিশালী, তার ধারণা পাওয়া যাবে। শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সুদের হার নিয়ে ফেডের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। আর শ্রমবাজার দুর্বল হলে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের একটি কর্মসংস্থান প্রতিবেদনও বাংলাদেশের মতো উদীয়মান বাজারের বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারের কী হবে?

এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের এক দিনের দরপতনকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বড় পতনের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ বাংলাদেশের বাজারের নিজস্ব কিছু সমস্যা ও চালিকাশক্তি রয়েছে। দেশের মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, মুদ্রাবাজার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, কোম্পানির মুনাফা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা—এসব বিষয়ও বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং একই সঙ্গে তেলের দাম ও বন্ডের ইয়েল্ড উঁচু থাকে, তাহলে চাপ বাড়ার ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে।

তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল বার্তা হলো—আন্তর্জাতিক বাজারের আতঙ্কে সব শেয়ারকে এক চোখে দেখা যাবে না।

যেসব কোম্পানির ঋণ বেশি, আমদানি ব্যয় বেশি এবং মুনাফার মার্জিন কম—তাদের ঝুঁকি আলাদাভাবে দেখতে হবে। আবার কম ঋণ, শক্তিশালী নগদ প্রবাহ, রপ্তানি আয় ও স্থিতিশীল মুনাফার কোম্পানিগুলোর অবস্থান তুলনামূলক শক্ত হতে পারে।

সবশেষে নজর রাখতে হবে তিনটি বিষয়ে—তেলের দাম কোথায় যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের ইয়েল্ড কতটা বাড়ছে এবং ফেডের সুদের হার নিয়ে অবস্থান কী হচ্ছে।

কারণ এই তিনটি বিষয়ই পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ডলার, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, কোম্পানির মুনাফা এবং শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারের ওপর চাপ বা স্বস্তি—দুটিরই কারণ হতে পারে।