দেশের শিল্পায়নে অর্থের জোগান দিতে এখনো মূল ভরসা ব্যাংক। শেয়ারবাজারকে পাশ কাটিয়ে উদ্যোক্তারা সহজেই বড় অঙ্কের ঋণ নিতে পারায় শিল্প অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা নেমে এসেছে মাত্র ০.৩১ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্পখাতে ব্যাংক ঋণ দিয়েছে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, বিপরীতে শেয়ারবাজার থেকে এসেছে মাত্র ৩০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, শিল্পখাতে ১০০ টাকা অর্থায়নের মধ্যে শেয়ারবাজারের অংশ মাত্র ৩১ পয়সা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শেয়ারবাজারে। নতুন ও ভালো কোম্পানি বাজারে আসছে না, বিনিয়োগের সুযোগ কমছে, লেনদেন শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে, অন্যদিকে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোও আয় সংকটে পড়ছে।
কেন ব্যাংকই উদ্যোক্তাদের প্রথম পছন্দ?
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। ধরুন, একটি কোম্পানি নতুন কারখানা তৈরি করতে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চায়। উদ্যোক্তা যদি ব্যাংকে আবেদন করেন, কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একই অর্থ শেয়ারবাজার থেকে তুলতে গেলে কোম্পানিকে আইপিওসহ নানা regulatory প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা শেষ হতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
ফলে উদ্যোক্তার কাছে ব্যাংকই স্বাভাবিকভাবে সহজ পথ হয়ে উঠছে। কিন্তু এর ফলে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ গিয়ে পড়ছে ব্যাংকের ওপর। আর শেয়ারবাজার হারাচ্ছে নতুন কোম্পানি, নতুন বিনিয়োগ এবং বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহের সুযোগ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যানই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শিল্পখাতে ব্যাংক থেকে যেখানে ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা এসেছে, সেখানে শেয়ারবাজার থেকে এসেছে মাত্র ৩০২ কোটি টাকা।
আগের বছরও পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিল না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিল্প অর্থায়নে শেয়ারবাজারের অংশ ছিল ০.৭৬ শতাংশ বা ৬৭৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ০.৬৭ শতাংশ বা ৬৪১ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ০.৯৪ শতাংশ বা ৬৮৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে শিল্প অর্থায়নে শেয়ারবাজারের অংশ বাড়ার পরিবর্তে আরও কমেছে।
এতে সমস্যা কোথায়?
সমস্যাটি শুধু শেয়ারবাজারের নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ব্যাংকের আমানত মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একটি বড় কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ ফেরত পেতে অনেক বছর সময় লাগে। এমন প্রকল্পের বড় অংশ যদি ব্যাংকঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়, তাহলে ব্যাংকের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, শেয়ারবাজারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করলে কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন পায় এবং সেই অর্থের বিপরীতে নিয়মিত ব্যাংকঋণের মতো কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে না।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা শিল্প অর্থায়নে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটালের সিইও সুমিত পোদ্দারের প্রস্তাব—নতুন প্রকল্প বা ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ এবং ৪০ শতাংশ শেয়ারবাজার থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
অর্থাৎ ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হলে সর্বোচ্চ ৬০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে এবং অন্তত ৪০ কোটি টাকা শেয়ারবাজার থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ব্যাংকের ওপর চাপ, শেয়ারবাজারে খরা
শিল্প অর্থায়নে শেয়ারবাজারের অংশ কমে যাওয়ার আরেকটি বড় ফল দেখা যাচ্ছে বাজারের দৈনন্দিন লেনদেনে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গত এক বছরের ২৪৮টি লেনদেন দিবসের হিসাবে মোট লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬০২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এতে দৈনিক গড় লেনদেন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা।
কিন্তু বাজারমধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে টেকসইভাবে পরিচালনা করতে দৈনিক অন্তত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা লেনদেন প্রয়োজন।
অর্থাৎ, প্রয়োজনের তুলনায় বাজারের গড় লেনদেন অনেক নিচে।
এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে চলতি বছরের ১২ জুলাই—১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছিল ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর—মাত্র ২৬৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লেনদেন ছিল ৫৬৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এক বছর পর ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৭৫৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা হলেও বাজারের সক্ষমতার তুলনায় এটি এখনো খুবই কম।
লেনদেন কমায় ব্রোকারেজ ব্যবসায় ধস
বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
জানা গেছে, বাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লেনদেন কয়েকটি বড় ব্রোকারেজ হাউসের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। ফলে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় দিয়ে অফিস, কর্মী ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডিএসই টাওয়ারের নিকুঞ্জ কার্যালয়ে একসময় যেখানে প্রায় ১২০টি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস ছিল, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫টিতে। মতিঝিলের পুরোনো ডিএসই ভবনের প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গাও খালি পড়ে আছে।
একটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের মালিকের উদাহরণটি সংকটের গভীরতা বোঝায়। ৫ হাজার বর্গফুটের অফিস ছোট করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। কর্মীর সংখ্যা ১৫২ জন থেকে কমিয়ে ২৫ জনে নামাতে হয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলামের মতে, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে দৈনিক লেনদেন ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা এবং প্রতি বছর ১০ থেকে ১২টি মানসম্মত আইপিও বাজারে আনা প্রয়োজন।
আইপিও খরা কেন কাটছে না?
শেয়ারবাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো নতুন কোম্পানি না আসা।
প্রায় আড়াই বছর ধরে সাধারণ আইপিও কার্যত বন্ধ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের আইপিও অনুমোদন দেয়। এরপর এসএমই প্ল্যাটফর্মের একটি কিউআইও ছাড়া সাধারণ বাজারে উল্লেখযোগ্য নতুন আইপিও আসেনি।
এখানেও উদ্যোক্তাদের কাছে সময় বড় বাধা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদের মতে, ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে যেখানে ৩ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস সময় লাগতে পারে, সেখানে আইপিও প্রক্রিয়ায় অন্তত ১৫ মাস সময় লেগে যায়।
ফলে একজন উদ্যোক্তা যদি দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি ব্যাংকের দিকে বেশি ঝুঁকবেন।
সরাসরি তালিকাভুক্তি কি নতুন পথ খুলবে?
এই পরিস্থিতি বদলাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি আইপিও নীতিমালায় নমনীয়তা আনার পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে।
‘ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ বাই স্টক এক্সচেঞ্জ’ বিধিমালার খসড়াও তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি শেয়ারবাজারে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র্যাংকস পেট্রোলিয়াম, র্যানকন মোটরবাইক ও ফাইবার অ্যাট হোমসহ কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারে আসার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধন এবং বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
শুধু নতুন কোম্পানি আনলেই কি সংকট কাটবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইপিও বাড়ালেই হবে না। বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
২০১০ সালের ধসের পর দীর্ঘ সময়েও বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ার পেছনে সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, ভালো শেয়ারের সংকট এবং দুর্বল মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, ২০১০ সালের ধসের পর শেয়ারবাজার অনেকটাই অকার্যকর বা ‘নন-ফাংশনাল’ হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্জিন ঋণ ও ঋণাত্মক ইক্যুইটির সমস্যা। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত স্টকব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা।
তাহলে উত্তরণের পথ কী?
শেয়ারবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা হিসেবে না দেখে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এর জন্য প্রথমত, ভালো কোম্পানিকে দ্রুত বাজারে আসার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইপিও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। তৃতীয়ত, সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ কার্যকর করতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের মধ্যে অর্থায়নের একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা।
কারণ একটি উদাহরণেই পুরো সমস্যাটি বোঝা যায়—একটি ১০০ কোটি টাকার শিল্প প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ যদি ব্যাংক থেকেই আসে, তাহলে ব্যাংকের ওপর চাপ বাড়বে; কিন্তু একই প্রকল্পের একটি অংশ শেয়ারবাজার থেকে এলে উদ্যোক্তা যেমন বিকল্প মূলধন পাবেন, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও নতুন ও ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।
তাই দেশের অর্থনীতি বড় হলেও যদি শিল্পের অর্থায়নে শেয়ারবাজারের অংশ মাত্র ০.৩১ শতাংশে নেমে আসে, তাহলে শুধু শেয়ারবাজার নয়—পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ভারসাম্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে শেয়ারবাজারকে আবার শিল্পের অর্থায়নের কার্যকর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো। সেটি সম্ভব হলে নতুন কোম্পানি আসবে, লেনদেন বাড়বে, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়াবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্যও বাড়বে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ।






















