শেয়ারবাজারের উত্থান-পতনের দায় এককভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর চাপিয়ে দিলে বাজারের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ (সিডিবিএল), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলে এর পুরো কৃতিত্ব যেমন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেওয়া যায় না, তেমনি দরপতনের সময়ও সব ব্যর্থতার দায় শুধু নিয়ন্ত্রকের ওপর চাপানো সমীচীন নয়। বাজারের স্বাভাবিক গতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পক্ষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধিতে ক্রেতাকেও নজরদারির আওতায় আনার দাবি
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য নজরদারি বা সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি। বিশেষ করে কোনো কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকলে শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেই যথেষ্ট নয়।
যেসব বিনিয়োগকারী ধারাবাহিকভাবে ওই শেয়ার কিনে সেটির দর অস্বাভাবিক বা অতিমূল্যায়িত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের লেনদেনের ধরনও পর্যালোচনার আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
একইভাবে কোনো কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে কমতে থাকলে এর পেছনের কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদেরও অতিমূল্যায়িত দরে শেয়ার কেনার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি দরপতনের সময় আতঙ্কিত হয়ে একযোগে বিক্রির চাপ তৈরি না করে বাজার পরিস্থিতি ও কোম্পানির মৌলভিত্তি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
পতনের বাজারে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ লেনদেন
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধানসহ সব সূচক কমেছে। একই সঙ্গে লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরও কমেছে।
তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এক দিনের সূচক পতনকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বাজারের সামগ্রিক ওঠানামার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারের এই ওঠানামা যেন অতিরিক্ত অস্থিরতায় রূপ না নেয়, সে জন্য বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ জরুরি।
তাদের মতে, বাজারে কেনার প্রবণতা বাড়লে সাধারণত সূচকে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে দরপতনের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা একযোগে ক্রয় কমিয়ে দিলে বিক্রির চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই বাজারের পরিস্থিতি বুঝে শেয়ার কেনাবেচায় ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
শুধু বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেই ক্রয়ের প্রবণতা বাড়ানো নয়, বরং কোম্পানির মৌলভিত্তি, মূল্যায়ন ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিয়মিত ও দায়িত্বশীল লেনদেনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
গুজবে নয়, তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে শেয়ার কেনাবেচা থেকে বিনিয়োগকারীদের বিরত থাকা উচিত।
কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা, আর্থিক অবস্থা, আয়, সম্পদ, ঋণ পরিস্থিতি এবং প্রকাশিত অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নিয়ে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
কমেছে ডিএসইর প্রধান সূচক
সোমবারের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫২৫ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসইএস ৩ দশমিক ১২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১০০ দশমিক ১৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৯৭ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
এদিন ডিএসইতে মোট ৩৯৪টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ১২৫টির শেয়ারদর বেড়েছে, ২২৪টির কমেছে এবং ৪৫টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ১৯ কোটি টাকা
সূচক ও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমলেও দিনের লেনদেনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ডিএসইতে সোমবার প্রায় ৭৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
আগের কর্মদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে এক দিনের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৯ কোটি ৬ লাখ টাকা।
সিএসইতেও সূচক ও লেনদেন কমেছে
অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সোমবার মোট ১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কর্মদিবসে সেখানে লেনদেন হয়েছিল ৩৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
এদিন সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭১টির শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে, ৯৮টির কমেছে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৫ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৭৭৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগের কর্মদিবসে সূচকটি কমেছিল ১২৮ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট।
সব মিলিয়ে, বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে শুধু নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে এক্সচেঞ্জ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
























